মহামারীর মুখে
স্বীকার না করে উপায় নেই, এমন আশঙ্কার, ভয়ের বাতাবরণ আমাদের প্রজন্ম তো কোন ছার, আগের প্রজন্মও দেখেনি সম্ভবতঃ। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ম মেনে আপাতত ঘরবন্দী হয়ে থাকাটাই শ্রেয়, নিজের ও সবার কথা ভেবে। দিন চালানোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যাবে, এই আশ্বাস দুই সরকারই দিয়েছেন। আপাতত তাঁদের কথায় ভরসা করা ছাড়া কোনও গতি নেই।
এই যে সামনের একুশ দিন, এতে আমাদের কী কী করণীয়, ভাবছিলাম:
১। বাচ্চা-বুড়ো নির্বিশেষে নিজেকে ব্যতিক্রম না ঠাওরে ঘরে বসে থাকা। নিত্যসামগ্রী কেনার প্রয়োজনে পরিবারের যে-কোনো একজন বেরুনো। হাত-ধোয়া, ইত্যাদি তো বাদই দিলাম।
২। যদি "কেন বসে থাকবো" প্রশ্নটি মনে জাগে, যথাযোগ্য স্থান থেকে ভাইরাস এবং অসুস্থতা সম্বন্ধে জানুন। এবং এই স্থানগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফেসবুকের স্ক্রীনশট বা whatsapp এর ফরোয়ার্ড নয়। সামান্য চোখ কান খোলা রাখলেই WHO এর ডকুমেন্ট পাওয়া, বা ডাক্তারদের বক্তব্য শোনা কঠিন নয়। সেগুলি শুনুন।
৩। ভাইরাসের আক্রমণের সঙ্গে তোলাবাজি গুলিয়ে ফেলবেন না। "পাড়ার মোড়েই তো যাচ্ছি, কিচ্ছু হবে না" কথাটি এক্ষেত্রে ঠিক খাটবে না। আপনার পাড়া তাই আপনাকে ছাড় দেবে, ভাইরাসটি এরকম নয় বলেই জানি। গেটের বাইরে মানেই আপনি সুরক্ষিত নন।
৪। সামনের ২১ দিন স্বাস্থ্যের দিক থেকে তো বটেই, মনের দিক দিয়েও খুব ক্রিটিকাল। কাজেই, নিশ্চিত না হয়ে কোনও খবর শেয়ার করবেন না। শেয়ার করলে সেগুলোকেই পরে 'গুজব'/ 'রটনা' বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এতে মিম হয়, কিন্তু বাকিদের (বিশেষতঃ বয়স্কদের) মানসিক অস্থিরতা বাড়ে। নাগরিক হিসেবে এই সচেতনতাটুকু আমাদের সবার কাছেই কিন্তু কাম্য।
৫। সবাইকে সব কিছু নিয়ে কথা বলতে হবে, এমন কিন্তু কোনও mandate নেই পৃথিবীতে। বরং যে যেটা জানেন, তিনি সেটুকু বললে অনেক সুন্দর লাগে শুনতে। কাজেই করোনা-প্রকোপ চলছে মানেই যে আপনাকে বক্তব্য রাখতেই হবে, এমন নয়। বিশ্বস্ত সূত্র (উপরে উল্লিখিত) থেকে খবর পেলে জানান। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা (ঈশ্বর না করুন) থাকলে সকলের জ্ঞাতার্থে জানাতে পারেন, যেভাবে করোনার attack থেকে সেরে উঠে একজন জানিয়েছেন। কিন্তু এর বাইরে অযথা কথা বললেই সমস্যা। এতে আর কিছু না হোক, যাঁরা স্বাস্থ্যকর্মী, তাঁদের খুব অসুবিধা হয় নতুন করে বোঝাতে।
৬। এতকিছুর পরেও দেখবেন, আপনার টাইমলাইনে হতাশার খবরই বেশি, চিন্তান্বিত আলোচনারই যাওয়া আসা। খুবই সত্যি। অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু, তবু, যদি সাহিত্য শিল্পের সঙ্গে কোনোরকম ভাবে আপনি যুক্ত থাকেন, সে কর্মী হিসেবে হোক কি গ্রাহক হিসেবে, দয়া করে ফিরে যান শিল্পের কাছে। বলে বোঝাতে পারবো না, এই আকালে ফেসবুকে কেউ একটা গান গেয়ে আপলোড করলে, ছবি এঁকে আপলোড করলে, একটা গল্প লিখে দিলে, কোনো মজার কার্টুন শেয়ার করলে, কী স্বস্তি লাগছে। দম নিতে পারছি। পছন্দের গান বন্ধুদের শোনান, কিছু লিখলে পড়ান, নতুন নতুন বইতে মুখ গুঁজে থাকুন, কিন্তু আশায় থাকুন। মহামারীর মুখে দাঁড়িয়ে এই কথাটা নেড়া-নেড়া শোনালেও, এর বিস্তৃতি আমার আপনার চিন্তার বাইরে।
এরকম দুঃসময়েই সবচেয়ে বড় আশার কথা উচ্চারিত হতে পারে। অসম্ভব নয়। জীবনের চেয়ে বড়, জীবনের চেয়ে বেশি সত্যি আর কিচ্ছু হতে পারে না। সেই জীবনেরই আশায় থাকুন, আশায় রাখুন। মানুষকে আনন্দে রাখা, আনন্দে থাকার মতো পুণ্য আর কিছুতে নেই। আলো হোক সব।
Comments
Post a Comment