জ্বর
ছোটবেলায় প্রতিবছর শীতের শুরুতে আমার নিয়ম করে জ্বর হত। পুজোর পর সবে স্কুল খুলেছে, এমন সময় জ্বর। কাজেই আবার হপ্তাখানেকের জন্য ডুব। জ্বর খুব বুঝতাম দুপুরবেলা, ভাত খাওয়ার পর। ক্যালপল খেয়ে, কাঁথামুড়ি দিয়ে পশ্চিমের ঘরে শুতাম। তখন সবে সবে উত্তুরে হাওয়ার আনাগোনা শুরু হয়েছে। শেষ দুপুরে পাখির ডানা-ধোয়া রোদে, সেই হাওয়ায় কপালের বিনবিনে ঘাম শুকিয়ে যেত, কি ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আরাম জ্বর ছাড়ার। কাঁপুনি ছেড়ে গিয়ে চোখ লেগে আসত ঘুমে। আর ঘুম ভাঙতো যখন, চোখে পড়তো, আকাশে ভীষণ মনখারাপের একটা মেটে-কমলা রঙ ছড়িয়ে দিয়ে দিন চলে যাচ্ছে। দিদি কখন জানি স্কুল থেকে ফিরে, পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাত পা আবার ঠাণ্ডা হয়ে আসতো। মা বাটিতে করে নিয়ে আসতো গরম মুড়ি আর বাদাম।
অনেক, অনেকদিন পর, নরেন্দ্রপুরে পড়ার সময় কখনও কখনও এরকম প্রথম শীতের বিকেলবেলায়, কলেজের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি আর উপমন্যু। ব্যোগেনভিলিয়ার পাতাগুলো কালচে হয়ে আসতো। আকাশে সেই মনখারাপি কমলা। ধূসর হচ্ছে আস্তে আস্তে, ঘড়িতে যদিও পৌনে পাঁচটা সবে। সামনের মাঠের চারদিকের বড় বড় গাছগুলো ছায়ার মতো হারিয়ে যাচ্ছে শীতে, উনুনের ধোঁয়ার মতো কুয়াশা নেমে আসছে পাতায় পাতায়। উপমন্যু বলতো, হস্টেলে চল, এখনও টিফিন পাওয়া যাবে। ডিপার্টমেন্টের বন্ধ দরজার পাশ দিয়ে নিচে নামতে নামতে একতলার সিঁড়ির জানলা দিয়ে চোখে পড়ে, উত্তুরে হাওয়ায় জংলা গাছগুলো দুলছে, ইতিউতি ফুলের গন্ধ।
-কি টিফিন রে আজ?
-মুড়ি-চপ। আর কী আশা করিস?
আশা কিছুই করি না। কারণ ততক্ষণে আমার মুখে আবার ছোটবেলার স্বাদ লেগে গেছে। উত্তুরে হাওয়া। বিকেলের মুড়ি। হাত-পা শিরশিরিয়ে ওঠে। জ্বর জ্বর লাগে।
Comments
Post a Comment