Followers

পুষ্প আপনার জন্যই ফুটে

ভোরের আলো ফোটারও একটু আগে বসন্তের শেষরাত্রির যে নির্ঝর বাতাস, ছুঁয়ে যায় ছাদের গায়ে এলিয়ে থাকা গুল্মের কুঁড়িকে। একরত্তি হিমের স্পর্শ পেয়ে সে চোখ বুজে বুজেও ভাবে, পৃথিবী তাকে চায় বুঝি! নাহলে এমন মায়ের মতো স্নেহের আয়োজন কী এমনিই?
  
ভোর হয়। হিমের আলপনা যত্নে মুছে দেয় প্রথম রোদ। তার কোমলতা দেখে 'যত্ন' নয়, 'যতন' বলতে মন চায়। বৃন্তের চাদর থেকে মুখ বার করে কুঁড়ি অনাবিল আনন্দে চেঁছে নেয় রোদটুকু। লুকোচুরিও খেলে রোদের সঙ্গে, পাতার আড়ালে, হাওয়ার আব্দারে।
  
বেলা কিছু বাড়লে বৃন্তের আশেপাশের পাতারা তাকে ছায়া দেয়। ইতিমধ্যে পৃথিবীর হৃদ্যতা দেখে সে আরেকটু মুখ বার করেছিল বটে, যেভাবে মানুষ সাহচর্যের মোহে বাড়াবাড়ি করে বসে। কিন্তু কুঁড়ি বোঝে নি, এতক্ষণে রোদ আর তার খেলার সঙ্গীটি নেই; সে তার প্রভু সূর্যের নির্দেশ মেনে চোখ রাঙিয়ে তাকাচ্ছে এদিক ওদিক; ভোরের যে বাতাসের সঙ্গে সে লাবণ্য বয়ে এনেছিল, এখন সেই বাতাসের উপরেই কর্তৃত্ব ফলিয়ে তাকে ক্ষেপিয়ে তোলে। রোদকে কেমন বিশ্বাসঘাতক মনে হয়; একই সকালে যাত্রা শুরু করে সে যেন তরবড়িয়ে বেশ সবার মনিব হয়ে গেল! মাটি শুকিয়ে যায়, টান ধরে। বৃন্তে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই আর।
  
হাওয়াকে ক্ষেপালে সে'ই বা ছেড়ে কথা বলবে কেন! দুপুর নাগাদ সে কেমন থুম মেরে যায়, যেন মানুষ, অভিমানে। পৃথিবী ছটফট করে। বৃন্ত নুয়ে পড়ে ক্লান্তিতে, ভারে। হয়তো বা কিছুটা লজ্জায়ও -- কারণ যাকে সে শেষরাত্রের হিমে, ভোরের সূর্যের পরশে এক নিরঞ্জন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, এখন তার নতুন-ধরা রঙে আর কী উপহার সে মিশিয়ে দিতে পারে! গাছ, মানুষ মাথা নিচু করে থাকে।
  
বিকেল নাগাদ হাওয়ার রাগ ভাঙাতে মেঘ আসে। উত্তর, পশ্চিমে ছিন্ন হয়ে ঘুরে বেড়ানোর অছিলায় তারা জমাট বাঁধে। নাম নেয় 'কালবৈশাখী'। নাম তো নয়, যেন স্পর্ধা! সূর্য ঢেকে যায়, মানুষের কুঠুরির ছোটবড় দেমাক ঢেকে যায়। বৃক্ষ সাহস দেখায়, বীরুৎ কেঁপে ওঠে, গুল্ম প্রাণপণ জড়িয়ে ধরে তার সহায়-সম্বল। ছোট্ট পাতাগুলি -- কী আর এমন সাধ্য তাদের! -- তবু জড়িয়ে রাখে কুঁড়িটিকে। বাতাস তান্ডব করে, বৃষ্টির গতিপথ সভ্যতার প্রথম নদের চেয়েও বেশি অশান্ত, বিহ্বল হয়ে ওঠে। সারাসন্ধে এই প্রলয়ে আশেপাশে ভেঙে পড়ে মহীরূহ, পাতা ছিঁড়ে যায়, ডাল ভাঙে, আধফোটা কুঁড়িটি হরিণের মতো ভয়ে দেখে, কত ফুল -- তার অমোঘ, কাঙ্খিত ভবিষ্যৎ -- খড়কুটোর মতো ঝরে পড়ে গেল। 
  
রাত্রি আসে। হাওয়ার মন ভালো হয়। মেঘও কেটে যায়। যেন এতক্ষণ কিছুই হয়নি, এই নিয়মে চাঁদ ঘুরতে আসে আকাশে। আগের রাতে এই বস্তুটিকে দেখার ভাগ্য তার হয়নি, তাই ঝড়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেয়ে যাওয়া কুঁড়িটি মুগ্ধতায় তাকিয়ে থাকে চাঁদের দিকে। ভারী অদ্ভুত লাগে তার কাছে সবকিছু; আশ্চর্য লাগে। প্রথম স্নেহ, লাবণ্য পেরিয়ে এটুকু সামান্য সময়ে তার ভয়, নৈরাজ্য, কষ্ট, ক্লান্তি, সংশয়, নিজের অমোঘ মৃত্যু, সবই দেখা হয়ে গেল। এখন, দ্যাখো, কী ভরাট জোছনা এসে ভুলিয়ে দিতে চাইছে সব। শহরের এত লক্ষকোটি বাড়ির ছাদ একইভাবে ধুয়ে যাচ্ছে সেই চন্দ্রমায়, একইভাবে প্রতিটি বাগানে, গাছে, শাখায়, বৃন্তে প্লাবিত হচ্ছে মাধুর্যের, শান্তির সুর। কিন্তু, কই, যখন মনে হচ্ছিল পূর্ণ হয়ে ফোটার আগেই বুঝি বা শেষ হয়ে যাবে তার জীবন, কেউ তো এ' আশ্বাস দেয় নি।
  
চাঁদও তার পরিক্রমা সেরে পশ্চিমের পথ ধরে। কুঁড়িটির ঘোর কাটে সে দেখে, হঠাৎ মনে হয়, স্ফুরণের আগেই সে যেন বড় হয়ে গেছে অনেকটা। এই যে আগামী কদিনের জন্য তার যে সামান্য জীবন, সে যতই সামান্য হোক না কেন, পূর্ণ এক বৃত্তান্ত। কোনো সভ্যতার ইতিহাসের চেয়ে কম নয়। তার আভাস সে পেয়েছে। শেষরাত্রির নির্ঝর হাওয়া দেয়। বৃন্ত বোঝে, কুঁড়ি ফুলের বোধ পেয়েছে। কুঁড়ি বোঝে, স্নেহ-ভালোবাসা-কষ্ট সবই পড়ে পাওয়া। সত্যি শুধু এই একটুখানি বেঁচে থাকা, নিজের জন্য, নিজের প্রতি। 
  
ভোরের আলোয় একটি কুঁড়ি অবশেষে ফুল হয়ে ফোটে।

Comments

  1. একটা কচি নীলকন্ঠ দেখলাম ♥ বড় সুন্দর লাগলো !

    ReplyDelete

Post a Comment