সখ্য নিয়ে কিছু কথা
কবিতাকে সাধারণত কিভাবে দেখা হয়, দেখা যাক। আগের দিন যেমন বলছিলাম, বই বেরুলে আমাকে "কি নিয়ে লিখলে" জিজ্ঞেস করার পর যে প্রশ্নটি করা হয়, "কটা লিখলে?" আমার গতবছরের বই 'সখ্য'তে কবিতার সংখ্যা ৮০। সেটা বললেই আদ্ধেক পাঠক হালকা হয়ে যায়। দুই মলাটের মধ্যে ৮০টা কবিতা একসঙ্গে দেখতে অনেকেরই ঘোর আপত্তি। অবশ্য সমস্যা ৮০-তে নয়। এর আগে 'আলোকজন্ম, আঁধারকাব্য'-তে খান চল্লিশেক কবিতা রেখেও আমাকে "বাবাঃ! চ-ল্লি-শ!" শুনতে হয়েছে। সেটা কথা না। কথা হলো, গদ্য সহজ ও কবিতা কঠিন, গদ্য সহজে আঁকড়ে কোনো একটা ওপর-ওপর অর্থ পেয়ে শান্ত হওয়া যায় আর কবিতা মানেই তার আগামুড়ো খুঁজে পাওয়া যাবে না -- এই একটা সহজ সমীকরণে আমরা বেঁধে নিয়েছি নিজেদের। তাই, 'স্মৃতিকল্পকথা'য় ৬৪টা গদ্য রেখেও বিশেষ সমস্যায় পড়তে হয়নি আমায়। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে প্রায়শঃই মনে হয়, পাঞ্চলাইন বা মুখঝামটা কন্টেন্ট ব্যতিরেকে আর কিছু নিয়ে লিখলে একসঙ্গে ১০টার বেশি রাখা উচিত কিনা!
হয়তো ওই সহজ সমীকরণের সূত্র ধরেই আমরা এটাও মোটামুটি ভেবে নিয়েছি, যে কবিতার বইয়ের সমস্ত কবিতাই একে অন্যের চেয়ে আকাশ-পাতাল আলাদা, এবং গোটা বইটা একটা বকচ্ছপ বা হাঁসজারু প্রকৃতির পয়দা। কবিতাও যে গল্প বলতে পারে, কবিতাও যে সহজভাবে গল্প বলতে পারে, এটা আমরা বিশেষ একটা ভাবি না; তারও যে কথ্য ভাষা থাকতে পারে, তার অপেক্ষাকৃত অপিরিচিত ভাষা ব্যবহারের মধ্যে যে শুধুমাত্র কাব্যিক অলংকার নয়, আরো কিছুও ফুটে উঠতে পারে, একটা বইয়ের ৫০টা কবিতার আলাদা আলাদা নাম হলেও তাদের কোথাও যে একটা সংযোগ আছে, থাকতে বাধ্য, না হলে বইটা হবে না -- এটা আমাদের কল্পনাতীত।
'সখ্য'র কথায় আসি। ৮০টা কবিতা। ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছেড়ে পালাচ্ছে সবাই। "হুম" বলে হারিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু একটুখানি সময় দিলেই দেখা যেত, 'সখ্য'-র মতো ছাত্রবন্ধু-সুলভ বই দুটো নেই। তিন ভাগে ভাগ করা, এবং রিলে-রেসের মতো প্রথম ভাগের বেটন দ্বিতীয় ভাগ, এবং দ্বিতীয় ভাগের বেটন তৃতীয় ভাগ তুলে নেয়। এই তিন ভাগ ও আশিটি কবিতা জুড়ে একটাই গল্প, দু'জন মানুষের। তাদের সাক্ষাৎ, স্পর্শ ও স্তব্ধতা নিয়ে।
কবিতাগুলিকে প্রেমের কবিতা বলা যেতে পারে কি, সাধারণভাবে? পারে, আবার না-পারার সম্ভবনাও প্রবল। কারণ, প্রেমের কবিতায়/কবিতার সিরিজে অন্ততঃ একবার, কিছু সময়ের একটা অংশ তৈরি হয়, যেখানে পূর্ণতা ঝলমল করে। 'সখ্য' পূর্ণতার ধারকাছ দিয়ে যায় না। এমন কোনো মুহূর্ত তৈরিই হয় না সখ্যে, অন্ততঃ আমি তো তৈরি করিনি বলেই মনে করি, যেই ক্ষণে আর কিছু চাওয়ার থাকবে না। 'সখ্য' মূলতঃ না-পাওয়ার কবিতা, তার প্রতিটা পংক্তিতে হারিয়ে ফেলার সাংঘাতিক ভয় আছে, এবং অমূলক নয় সেই ভয়, তাই তার একটা জার্নি আছে। প্রেমের কবিতায় এরকম সময় আসে, যখন স্পষ্ট করে 'ভালোবাসি' বলা যায়। 'সখ্য' তা বলতে পারে না। 'সখ্য'-তে অনেক বেশি না-বলা, বা ওই শেষ 'ভালোবাসি'টুকু না বলতে পারা, কারণ তাতে অধিকার বিঘ্নিত হয়। অতএব ...
বইয়ের বহু কবিতাই যেন একজনের কথা অন্যজনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু আবারও, একটু সময়ের অপেক্ষা। বেশির ভাগ কবিতাই আসলে মনোলগ, নিজের ভেতরে বলে চলা কথা, ধরে নেওয়া যে অন্যজনের কাছে সব কথা একদিন ঘর পাবে। যেগুলো সত্যিই ডায়ালগ-ধর্মী কবিতা, তাদেরও আড়াল আছে। পাঠক ঠিকই খুঁজে পাবেন।
'সখ্য'-র ভাষা কাব্যভাষা কিনা? প্রথমতঃ, আমার মনে হয় না আলাদাভাবে কাব্যভাষা বলে কিছু হয়। আমাদের সমস্ত ভাষা নির্ভর করে আমাদের অবস্থানের ওপর। রাতের আকাশে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তারাদের দিকে তাকানো একরকম, কিন্তু উদ্দেশ্যহীনভাবে রাতের আকাশে তাকিয়ে যখন নিজেকে খুব ছোটো মনে হয়, তখনই কি তারাদের 'নক্ষত্র' বলে ডাকতে ইচ্ছে করে না? ঢেউয়ের গতি, ওঠাপড়া বুকে এসে লাগলে সে ঢেউ 'তরঙ্গ' হয়ে ওঠে। ওঠে না? ওরকম আলাদা 'কাব্যভাষা' দিয়ে কিছু হয় না, জোর করে কবিতাকে দুয়োরানী করে রাখা ছাড়া।
ছবি: শুভংকর
Comments
Post a Comment