রিভিউ: একটি সেলসম্যানের মৃত্যু
10th Planet প্রযোজিত 'একটি সেলসম্যানের মৃত্যু'। প্রথমেই, সাধুবাদ যে যে কারণে --
১। খুব সাবলীল, ঝরঝরে অনুবাদ। অন্য কারুর অস্তিত্ব ভেঙে মায়ের রূপ দেওয়া কঠিন -- মাতৃভাষার চরিত্রই এমন। কিন্তু বাংলা ভাষার যে স্বাভাবিকতা, সেটা এই অনুবাদে পাওয়া গেছে। পুরো টেক্সটে অনুবাদকের 'দায়' কখনও চোখে পড়েনি আমার। হয়তো এক-দু জায়গায় খুব rigorous physical activity-র সঙ্গে "প্রতিনিয়ত miss করি"-র মতো কথা আমার একটু বেখাপ্পা লেগেছে। কিন্তু তার ভার সামান্যই, ও অতিক্রম্য। ধন্যবাদ, শরণ্য।
২। অভিনয়, এবং বিশেষতঃ, টাইমিং। গোটা নাটক জুড়ে অবিরাম ছোট-বড় মুহূর্ত উঠে আসে যা 'কমিক' বা 'ট্র্যাজিক' হওয়ারও আগে, witty. শরণ্য আর সমুদ্রনীলের অনবদ্য টাইমিং-এর সেন্স। খুব সাধারণ কথা থেকেও হাসি খুঁজে আনার কঠিন কাজ এঁদের হাতে পড়ে সহজ হয়েছে। বিশেষতঃ শরণ্য'র comic grumbling মনে রাখার মতো। সেলসম্যানের বড়ছেলের ভূমিকায় সমুদ্রনীল কণ্ঠে, চলনে, অভিব্যক্তিতে দুর্দান্ত। সমুদ্রনীলের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে জানি, ও নাটকে নিজের ভূমিকা নিয়ে কী পরিমাণ সচেতন এবং সচেষ্ট। তার প্রকাশ মঞ্চে আবার দেখলাম।
৩। Minimalist approach. পরিমিতিবোধ। অর্থাৎ, আমি একটা স্টেজ পেয়েছি বলেই prop দিয়ে ভরিয়ে দেবো না। আলোর কেরামতি দেখিয়ে বাজিমাত করার কথা ভাববো না। মিউজিক দিতে পারি বলেই প্রতি কথার পিছনে জেলুসিলের মতো আবহ বাজাবো না। থিয়েটারের মূলধন মানুষ। মানুষ নিয়েই কাজ করবো যতটা পারি। কথায়, শরীরে, গল্পে মানুষকে ধরে রাখবো। এই কথাগুলো খুব বেসিক, কিন্তু নিয়মমতো, আজ এগুলোই দেখা যায় না অনেক বড় দলের কাজেও। এই নাটকে সেটা দেখলাম। খুব আনন্দ পেলাম।
এবার অপ্রাপ্তি --
১। শেষটা নিয়ে যদি আরেকটু ভাবা যায়। অন্তিম climax-টা শেষ দশ-পনেরো মিনিটে একটু dissipate করে যাচ্ছে। দর্শক হিসেবে মনে হচ্ছে বারবার, সবকিছু ফ্রীজ করে দেওয়ার সেই চরম মুহূর্ত পেরিয়ে আসছে নাটকটা। শেষদিকে এসে সংলাপের যে প্রাথমিক পরিমিতিবোধ, হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
২। মূল অভিনেত্রী (সেলসম্যানের স্ত্রী'র ভূমিকায়) হতাশ করেছেন আমায়। কণ্ঠের ওঠানামা, অভিব্যক্তির বদল, তাঁর অন্তরের যে আলোড়ন, তার প্রকাশ -- কিছুই তাল মেলাতে পারেনি বাকিদের সঙ্গে। নাটকের বিস্তর ওঠপড়ার মাঝে তিনি এক সনাতন X-axis হিসেবে রয়ে গেছেন।
৩। শরণ্য'র অভিনয়ে টাইমিং যেমন আমায় ছুঁয়ে গেছে, তেমন আমায় অপূর্ণ করেছে তাঁর কিছু উচ্চারণ। চরিত্রের প্রয়োজনে হয়তো তরবড়িয়ে কথা বলার পন্থা তাঁকে নিতে হয়েছে। কিন্তু দ্রুততার মধ্যেও distinction থাকা প্রয়োজন। আমার অনুরোধ রইলো, এ বিষয়টায় আরেকটু নজর দেওয়ার।
৪। নাটকের কমিক মুহূর্তগুলো যত মনে রয়ে যায় শেষে, pathos সেভাবে মনে থাকে না। শেষে শরণ্য'র কণ্ঠে "ও কাঁদছে কেন?"-টুকু বাদ দিলে এই ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া pathos অনুপস্থিত নাটকে। উপস্থাপনা আমাকে ভাঙে, কিন্তু কাঁদায় না। অহংকার, arrogance এর মধ্যেও যে এক ধরণের হাঁটু-মোড়া submission আছে, সেটা আরও ফিরে আসা প্রয়োজন বলেই আমার মনে হয়েছে।
প্রযোজনার আরও বিভিন্ন বিভাগে যাঁরা কাজ করেছেন, সবাইকে আমার শুভেচ্ছা। আগামীতে আরো ভালো কাজ হয়ে চলুক।
Comments
Post a Comment