রুনি দিদি
কিছুজনকে দেখে আমরা বড় হতে শিখি, আর কারুর কারুর সঙ্গে আমরা বেড়ে উঠি। রুনি দি আমার কাছে দুইই। খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ে না, কিন্তু যবে থেকে মনে করতে পারি, আমার আর রুনি দি’র মধ্যে যেমন তুমুল ঝগড়া হয়েছে, তেমনই গড়াগড়ি দিয়ে হাহাহিহি-ও। মনে পড়ে, কোনও কোনোদিন বিকেল চারটে বাজলেই (শীতে সাড়ে তিনটেয়) মা’র সঙ্গে যেতাম যাদবপুরের টিচার্স’ কোয়ার্টারসে, মাসিমণির বাড়িতে। আমরা গেলে চায়ের কাপ নিয়ে মা আর মাসিমণি বসতো ছোট বারান্দাটায়, মেসোমশাই নিজের পড়ার টেবিলে চা নিয়ে; আমি আর রুনিদি ভেতরের ঘরে। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে টেপ রেকর্ডারে সাঙ্ঘাতিক জোরে চালানো হতো ‘রোজা’র গানগুলো। শ্বাসরোধ করা বৈঠকের আগে মানুষ যেভাবে পায়চারি করে, রুনি দি ওভাবে হেঁটে হেঁটে গান শুনত। আমি বিছানায় বসে গান শুনতাম আর ওরকম হনহনিয়ে হাঁটা দেখতাম। ‘দিল হ্যায় ছোটা সা’ শুনলে লোকের মনে আজও পুলক জাগে, আর আমার আজও মনে হয় রুনি দি পায়চারি করছে। যাগগে যাক সে কথা। আরেকটা ক্যাসেটও ছিল, মোটা প্লাস্টিক কভার দেওয়া, সামনে কি সব কুচি কুচি রঙ বেরঙের ছবি, আর প্রথম গানটা হল ‘আজকাল তেরে মেরে পেয়ার কা’, রিমেড ভার্শন। সম্ভবত বাবা সায়গলের গাওয়া। এটাও শোনা হতো। অভিনব পদ্ধতিতে রিওয়াইণ্ড-ফরওয়ার্ড করাও রুনি দি’র থেকেই শেখা। গান চলছে, ওই অবস্থায় রিওয়াইণ্ড বা ফরওয়ার্ড চিপে ধরো। ব্যস, বাবা সায়গল একেবারে চিঁ চিঁ করে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এই করে আমরা অনেক, অনেক, অনেক ক্যাসেট নষ্ট করেছি।
হাসাহাসি কি নিয়ে হতো? জনসন-রনসনকে নিয়ে। একজন বলত, বুঝলে তো ব্যাপারটা হচ্ছে এই। সঙ্গে সঙ্গে অন্যজন বলতো, যথার্থ কথাটা হবে এই। দুজনেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথাই বলতো, আর আমরা এদিকে হেসে গড়িয়ে, নিজেদের মধ্যে ওভাবে কথা বলার চেষ্টা করে তার কোনও মানে খুঁজে না পেয়ে আরও হেসে ... সে এক ব্যাপার! ঝগড়াও হতো তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যাপারে। তখন আমি ক্রিকেট পাগল। একদিন রুনি দির ল্যাজে ল্যাজে কোয়ার্টারসের ছাদে গেছি। সেখানে বেচারি রুনি দি গল্প করবে টুয়া দি, মুন্নি দি’র সঙ্গে। কিছুর মধ্যে কিছু না, আমি হঠাৎ সবাইকে বোঝাতে শুরু করলাম, কেন আগরকরের টীমে চান্স পাওয়া উচিত না। ন’ বছরের ছোট ভাই, নেহাৎ ধরে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া যায় না নিচে, তাই মায়া দয়ার খাতিরে আমাকে বলতে দেওয়া হল। কিন্তু নিচে নেমে এসে তারপর কি ঝামেলা রে ভাই! যত বলি, আরে সামনে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ, বোলিং অ্যাটাকটা সাজিয়ে নেওয়া দরকার আগে, তত বলে, আগরকর খেলল কি শ্রীনাথ, তাতে তোমার কি! এই দুই বোলারকে নিয়ে বোধ হয় সিলেক্টররাও এত ঝগড়া করেনি কখনও।
এ তো গেল ছোটবেলার কথা। বড়বেলায় (মানে আমার বড়বেলা আর কি) এসব আলোচনা পাল্টে গেছে অন্য কথায়। কখনও লেখা নিয়ে কথা, কখনও সিনেমা নিয়ে, কখনও একেবারে নিজের কিছু কথা যেগুলো তখনও অব্দি কাউকে বলিনি, সেগুলোও বলেছি রুনি দি-কে। কোনও কিছুর ব্যাপারে দু’জনের মতও আলাদা অনেক। রুনি দি সবকিছুর মধ্যেই ভালো যা, তাকে নিতে চায়; আর আমি অবধারিত ভাবে তার অন্ধকার দিকটা দেখি। দেখা তো দুজনেরই, আলোচনা তো দু’ তরফেই।
তবে, শেষ অব্দি সময়ই জেতে, কারণ সে পালায়। আর পালাতে পালাতে আমাদের ওপর অনেক দায় দায়িত্ব, ব্যস্ততা বাড়াতে থাকে। দুটো শহরের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে থাকে। আগেকার মতো সেলিমপুর আর যাদবপুর না, দূরত্ব ছড়িয়ে পড়ে দেশ বিদেশের শহরে। দেখা হলে এখনও দারুণ গল্প-আড্ডা চলে, কিন্তু দেখাই আর হয় না! তবু, নদী রচনায় গরুর কথা লেখার মতোই, সব শেষে আমরা এ’ সব মেনেই নি। যেগুলো সহজে মানি না, একটা সময়ের পর তারা অভ্যেস হয়ে যায়। যেমন, দেখা না হওয়া, কথা কম হওয়া, এইসব। আশ্বাস এটুকুই, যখনই দেখা হোক, কথা আগের মতোই হয়।
কাল, জন্মদিনের আগে, অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা।
Comments
Post a Comment