Followers

দেয়ালা

দেখতে দেখতে দিন, মাস, এমনকি যাচ্ছিনা-যাবোনা করে বছরও কেটে যায়। সূর্য পুবে উঠে পশ্চিমে নামার ফাঁকে উত্তর থেকে দক্ষিণে সরে, তারপর আবার দক্ষিণ থেকে উত্তরে। চাঁদ পক্ষে-পক্ষে অদৃশ্য হয়, আর শহরের থেকে দূরে রাত্রের আকাশে এখনও নক্ষত্র জ্বলে ওঠে। উল্কাপাত, ছায়াপথ, ধূমকেতু, সবই কপালের ব্যাপার, কিন্তু মঞ্চ সবসময়ই প্রস্তুত থাকে এসবের। শুধুমাত্র বাড়ির ছাদে কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরে পড়ার মতো নির্লিপ্তি নিয়ে তারা খসে পড়ে না, এটুকুই যা তাকে সাধারণ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। 
   
কানহা ন্যাশনাল পার্কে তখন ভোর হয়েছে সবে। কিসলি গেটের খুব কাছে, জঙ্গলেরই বহিরাংশে আমাদের ডিলাক্স কটেজের ছাদে হঠাৎ সরসর। ঘুম ভেঙে গেছে। পর্দা টানা চারদিকে, তার আড়ালেই বুঝতে পারছি, আলো ফোটেনি ভালো করে। আর মাথার ওপরের শব্দটি কটেজকে ছেয়ে থাকা মহীরূহের সামান্য একটি ডাল থেকে শুরু করে ঝরা পাতার ওপর দিয়ে সাপের চলন, সবই হতে পারে। শব্দটা থেমে থেমে হচ্ছে, গোটা চাল জুড়েই। সম্পূর্ণ জেগে বিছানা থেকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি সিলিংয়ের দিকে। 
  
দিদির অন্য বাড়ি যাওয়ায় দিন, এই বাড়ি ছেড়ে। আগের দিনের চরম ক্লান্তি আমাদের সবার। তদুপরি বাসরের হাহাহিহি। সবে সে' সব থেমেছে ঘন্টাখানেক হলো। বিয়ের রাতের শেষে যেমন সবাইই ভারি ঘুমোতে চায়, কিন্তু ঘুম কারুরই আসে না, কিন্তু তাও সকলেই কী একাগ্রভাবে ঘুমোতে যায়, এ তেমনই এক সময়। ভাড়াবাড়ির একফালি বারান্দায় আমি আর এক বন্ধু তখনও জেগে, কারণ আমরা জীবনের সার সত্য জেনেছি, ঘুম হবে না। দুটো চেয়ার জুটিয়ে রেলিঙে পা তুলে দিয়ে বসে আছি। ঘড়িতে ভোররাত। নিচে কেটারিংয়ের লোকজনদের বাসন-কোসন গোছানোর আওয়াজ। অনতিদূরে বড় রাস্তায় হুশ-হাশ ট্রাক বা গাড়ি চলে যাওয়ার আওয়াজ। আরো কিছুক্ষণ যায়। ঘুম হয়তো আসেনি কারুরই, কিন্তু কেউ বলছে না। কেউ উঠছে না। গতসন্ধ্যার ফুল বাসি হয়েছে। তাদের গায়ে কালো দাগ পড়েছে। এক ঝলক মনে পড়ে দিদির ঘরটার কথা। আসছে সন্ধে থেকে তার চেহারা বদলে যাবে। ছোটবেলায় দিদি কপালে লিপস্টিক লাগিয়ে লক্ষ্মীঠাকুর সাজতো। এখন তেমনই সেজে আছে। আধো ঘুম। আধো জাগা। দূরে কারখানার সাইরেনে পাঁচটা বাজলো। 
   
একটা পুজোবাড়ি। ভোররাতে তার নিঃশব্দ ঠাকুরদালান। ফুলেমালায় মা রয়েছেন ভারি পর্দার আড়ালে, শয়নে। আলো ফোটেনি এখনও। শুধু বাড়ির পিছনের দো'তলার বারান্দায় টিমটিমে হলুদ আলো জ্বলছে। লাল মেঝে, কালো সরু টাইলস্ ধার দিয়ে। জানলার সবুজ খড়খড়ি। ও' মাথায় ডাঁই করে রাখা আছে ঠাকুরের বাসন, পিতলের বাসনের ওপর জলের টুপটাপ ব্যারিটোন বাজছে। আর আধঘন্টার মধ্যে বাড়িতে সবার আগে জাগবে এই বারান্দা। ভোর হয়েছে। শয়ন ভেঙেছে মায়ের। পাড়ার ছিমছাম গলি ধরে এগিয়ে আসছেন পুরুতমশাই। ভারি লোহার গেট ঠেলে খুলে দিচ্ছেন গৃহকর্তা। 
   
এইরকম থেমে যাওয়া সময়গুলোয়, আমাদের, যাদের জন্য উল্কাপাত, ছায়াপথ বা ধূমকেতু নেই, যাদের কাছে কোনো ম্যাজিক নেই শেষ হয়ে আসা বছর, বা অরণ্যের সিম্ফনি বা প্রিয়জনের বিদায়কে দীর্ঘায়িত করার, যারা বড় কিছুর ভারে একদিন হেরে যাওয়ার ভয়ে বরাবরই ছোটছোটো জীবন কাটিয়ে গেলাম বহুস্বরে, তাদের জন্য রোদ ওঠে। সূর্য উত্তর থেকে দক্ষিণে হেলে পড়ে, আবার দক্ষিণ থেকে উত্তরে। সময় ঘুরতে থাকে। কানহার অরণ্যে সেই সরসর শব্দ থেমে যায় মাথার ওপর। বোঝা যায় না, তার উৎস কী! হয়তো কোনো রেড-নেক পাখি, যার স্বভাব আড়াআড়ি হেঁটে যাওয়া কোনো কিছুর ওপর দিয়ে। ভুলে যাই সেসব। প্রথম রোদে জানলা দিয়ে মুখ বার করে দেখি হরিণের দল। বাসরের অমোঘ শোকের শেষে রোদ আসে। নিত্যতার ভিড়ে আবার যাতায়াত শুরু হয়। দিদিকে প্রথম রোদে সেদিন সত্যিকারের কনে মনে হয়। একদম সত্যি সত্যি। পুজোবাড়ি দশমীর দিকে এগোয়। কিন্তু রোদের হাত ধরে। মিলিয়ে যাবে সমস্ত রোদই। তবু, আমাদের জন্য সে রোজ আসে। হাত ধরে। "এই যে, আর একটুখানি" বলে বিচ্ছুরিত হয় গাছের ফাঁকে ফাঁকে, সোনার মতো। রোদ, কখনও কখনও, শুধু পূর্ণের জন্য ভরে ওঠে।

ছবি: শুভংকর

Comments