থিয়েটার ল্যাবের একটি নাটক
থিয়েটার ল্যাব প্রযোজিত 'একটি পিস্তল ও ডুমুরগাছ'
নৈহাটির ঐকতান মঞ্চে রণিত পালের নির্দেশনায় এই নাটক দেখে এলাম আজ। ভালোলাগার কথা নিশ্চিত অনেকেই বলবেন, এই ধরে নিয়েই আমি অপ্রাপ্তির কথা বলতে চাই মূলতঃ। রণিতের থিয়েটার-ভাবনা নিষ্ঠাবান। কাজেই আমার এই কথার কিয়দংশও যদি প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়, সে সেটুকু ছেঁচে নেবে, এই আস্থা আমার আছে তাঁর প্রতি।
ছোট নাটক। আধ ঘন্টা, টেনেটুনে পঁয়ত্রিশ মিনিটের। কিন্তু বলার যে বিষয়, তার গভীরতা অনেক বেশি। ফলতঃ, যে সম্ভবনা নিয়ে নাটকটি শুরু হয়, যে পূর্ণতার চাহিদা সে প্রথম একটি বা দুটি দৃশ্যে জারিত করে আমাদের মধ্যে, তা হঠাৎ করেই যেন ত্রিশ মিনিটের মাথায় তল্পিতল্পা গুটিয়ে নেয়। ডানা ভালো ভাবে মেলার আগেই নাটক শেষ। বিষয় প্রাসঙ্গিক এবং একই সঙ্গে তার আদর্শ চিরন্তন, কিন্তু সেইমতো তাকে গভীরে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া প্রয়োজন। যে কোনো শিল্পেই precision বা আড়াল কাম্য। কলকাতার মঞ্চে আড়াই ঘন্টার গোদা-গোদা অত্যাচারের যেমন কোনো মানে হয় না, তেমনই আড়াল যদি প্রকাশের চেয়ে অপ্রকাশ বেশি করে, সেটাও আমার মন ভরায় না। তাই, রণিতের কাছে অনুরোধ, অযথা ইল্যাবোরেশনের পথে সে যেমন হাঁটে নি, টুকরো-টাকরা জীবন জুড়ে ন্যারেটিভ গড়তে চেয়েছে, সেই ন্যারেটিভ পূর্ণতার জন্য যদি আরও আধ ঘন্টা দাবী করে, সেটা ভেবে দেখা হোক।
মঞ্চনির্মাণ, ডিজাইন মিনিমালিস্টিক, সুন্দর। বাচালতা নেই নাটকে। টিউশনের নোটের মতো আন্ডারলাইন করে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নেই। কিন্তু কিছু বহুল-ব্যবহৃত অস্ত্রের পুনর্ব্যবহার আছে। যেমন, "ইস্পাতের নলই তো ক্ষমতার উৎস"। শুনলেই মনে হয়, জানি। আর জানতে চাই না। যেমন, সাংঘাতিক ক্রুশিয়াল মুহূর্তে জীবনানন্দের কবিতা। সেই কবিতা আমি, আপনি যে-ই শুনি, "আহা"ই বলবো, কিন্তু নাটকের পরিপ্রেক্ষিতে আমি অনেক বেশি খুশি হবো জীবনানন্দের কবিতায় ফিরে যাওয়ার সহজ ও expected পন্থাকে সরিয়ে রেখে রণিত নিজের কথা বললে। Oblique reference চলতে পারে। যেমন, সুমনের "যে যেখানে লড়ে যায়, আমাদেরই লড়া" খুব সুন্দরভাবে এক লহমার জন্য ফিরিয়ে নিয়ে আসে সেই গানে, আবার ফিরে যায় নাটকে। ভালো লেগেছে।
তবু, অপ্রাপ্তি থাকলেও সাধুবাদ জানাবো এই প্রয়াসকে। অভিনেতাদের। সুরকারকে। খালি গলায় শুরুর গানটি এখনও মাথায় ঘুরছে। প্রযোজনাটির মধ্যে প্রভূত সম্ভবনা আছে বলেই আমার অপ্রাপ্তি, এবং এতগুলো কথা বলা। এবং এই বিশ্বাস নিয়েই বলা যে রণিত আলোচনায় আগ্রহী। একজন দর্শক হিসেবে "অন্য কিছু করলে ভালো হতো" বলে তো আমি খালাস! হাত ঝেড়ে বলতে পারি, "অন্য কিছু" ভাবার দায় নির্দেশকের। নিশ্চিত। নিশ্চিত তা-ই। কিন্তু প্রয়াসকে দেখার, মান্যতা দেওয়ার, এবং আলোচনা শুরু করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। নাটক মুহূর্তের সন্তান -- প্রতি মুহূর্তে সে গড়তে পারে, ভাঙতে পারে। রাজা বা কাঙাল হওয়ার সমান সম্ভবনা তার মধ্যে রয়ে যায় পরবর্তী উপস্থাপনায়।
Comments
Post a Comment