Followers

জন্মদিন: সৌমিক

খবরটা আগে থেকে আমার কাছে ছিল না। বিকেলের দিকে বিপ্রজিৎ এসে জানালো, আজ একজন পার্কশনিস্ট আসবে নগরবাউলের জন্য। ওরই ইউনিভার্সিটির জুনিয়র। একবার 'বাজিয়ে' দেখা যেতে পারে। 
  
তখন ডিসেম্বরের শুরু। স্ক্রিপ্ট মোটামুটি এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু নগরবাউল এত সাংঘাতিক রকম সুরধর্মী নাটক, যে তার একটা নির্দিষ্ট সাউন্ডস্কেপ তৈরি না হওয়া অব্দি রিহার্সালে নামা মুশকিল। এবং সেটা তৈরির জন্য গীটার বা উকুলেলের দায়িত্বে যেমন বিপ্রজিৎ, তালের দায়িত্বে একজন কারুর থাকা দরকার। কাজেই, কোনো পার্কশনিস্ট ব্যান্ডে নয়, নাটকে বাজানোর উৎসাহ দেখিয়েছে, এইই বা কম কী!
  
সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এলেন পার্কশনিস্ট। হালকা হলুদ রঙের গলাবন্ধ ফুল শার্ট, একটা আশ্চর্য কাঠ-কাঠ কাটিংয়ের। সমস্ত দিকেই যেন শার্টটির বিকশিত হওয়ার প্রভূত সম্ভবনা ছিল, কিন্তু কাপড় ফুরিয়ে যাওয়ায় সে আর হয়ে ওঠে নি। কোমর ছাড়িয়ে একটু নেমে আরো নিচে যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো মর্মে শার্টটি থেমে গেছে। হাতাও গোটানো নয়, কব্জি অব্দি নামিয়ে বোতাম আটকানো। চোখে চশমা। ইংরেজিতে একটি শব্দ হয়, "flabbergasted", এর মুখটি দেখে আক্ষরিক তেমনই মনে হলো। সবকিছু দেখেই এই ছেলেটি ভীষণ অবাক --- ও বাবা এটা একটা ঘর! এরা মানুষ! এরা নাটক করে! ওমা দেওয়াল! আরিব্বাস জলের বোতল! চেয়ার, মাই গশ!
বিপ্রজিৎ আলাপ করিয়ে দিল, "এ হলো সৌমিক; আর ও শুভংকর দা, নগরবাউল লিখেছে।" তাতে ছোকরা আমার দিকে তাকিয়ে আধা-স্যালুট গোছের একটা ইঙ্গিত করলো (কালক্রমে বুঝেছি এটাই ওর হাত নেড়ে 'হেলো' বলার ভঙ্গী), আমি সামান্য ঘাড় নেড়েই কেমন ক্ষান্ত হয়ে গেলাম।
  
এই হলো আমাদের সৌমিক বসু - আকা - মিক বোস - আকা - মিকি বয় - আকা - বাজনা। ঠিক যেমন সায়নদীপকে 'শান' বা মৈত্রেয়ীকে 'ম্যাটি' বলে ডাকতে আমার প্রবল আপত্তি, তেমনই আমি সাধারণত মিকের আগে সৌ বসিয়েই ডাকি। প্রথমদিন সৌমিক কাহন এনেছিল না ডুবকি, খেয়াল নেই। কী বাজিয়ে শুনিয়েছিল, খেয়াল নেই। শুধু মনে আছে, অখণ্ড মনোযোগে নগরবাউলের স্ক্রিপ্ট-রিডিং শুনছিল। সেদিন সৌমিকের সঙ্গে আরও দুই মক্কেল এসেছিল, তারা পরদিন থেকে আর এ' মুখো হয়নি। কিন্তু সৌমিক থেকে গেছে। নগরবাউলে বাজালে টাকা পাওয়া যায় না। বরং অন্তর-রঙ্গে নাম লেখালে মাসে অল্প কিছু টাকা দিতে হয় উল্টে, তবু সৌমিক থেকে গিয়েছিল। কারণ, (বহুদিন পর ও বলে) ওর মনে হয়েছিল, ওর তৎকালীন 'ঘেঁটে যাওয়া' অবস্থার একমাত্র সদুত্তর ছিল নগরবাউল। ওর মনে হয়েছিল, ভালো থাকার জন্য ওর নগরবাউল করা প্রয়োজন। এবং এখন যা অবস্থা, নগরবাউল, কলন্দর, অন্তর-রঙ্গ'র সৌমিককে ছাড়া ভালো থাকা অসম্ভব।
   
সৌমিকের আরো কিছু বৈশিষ্ট্য জেনে নেওয়া যাক। ও একজন  ভোজনরসিক। Par excellence! সৌমিককে বিভিন্ন রকম খাবার রেঁধে দিয়ে যান। ও সেগুলো থেকে বিভিন্ন পারমুটেশন-কম্বিনেশনে আরো নতুন নতুন 'ডিশ' বার করে আনবে। তড়কা-সন্দেশ, মাটন-আইসক্রিম, আঙুর দিয়ে মাছের ঝোল, কাসুন্দি দিয়ে রাবড়ি, ইত্যাদি। তারপর এ'সব খেয়ে আমাকে সামনাসামনি বা মেসেজে জানাবে, "কাল অমুকের সঙ্গে তমুকটা মিশিয়ে খেয়ে এত ভালো লাগলো, কিন্তু তারপর থেকেই আমার পেটটা একটু ইয়ে হয়েছে, বুক পেটের দিকটা কেমন ইয়ে লাগছে যে কাল সারারাত ঘুম হয়নি, এখনও ইয়ে ভাবটা কাটছিল, কিন্তু তোমার বাড়ি আসার পথে খালি পেটে একটু নকুলদানা খেয়ে ফেলায় আবার একটু ইয়ে, যাক গে, তুমি বিপ্রদা-কে একদম বলবে না আমি অনিয়ম করেছি, ও মেরে ফেলবে আমায়।" And I am like "কী ভেবেছো অবোধ বালক, মারতে একা বিপ্রদা পারে? আমি ফেসবুকে মারবো, জন্মদিনের দিন মারবো, পোস্ট দিয়ে মারবো, চুন চুন কে মারবো!"
  
আমাদের নাটকের প্রথম ও শেষ দর্শক সৌমিক। আমরা যে কি সাংঘাতিক অল্টারনেটিভ থিয়েটার করি, আপনাদের কোনো ধারণা নেই। কী ভাবেন? দর্শক আমাদের এক/দুই/তিন দিকে? ঘন্টা! আমাদের চতুর্থ দিকেও একজন দর্শক স্থির বসে থাকেন ঈশ্বরের মতো -- সৌমিক বসু। প্রতিটা রিহার্সালে, প্রতিটা শোয়ের প্রথম মিনিট থেকে শেষ মিনিট অব্দি, সৌমিক নাটক দেখে একইরকম অবাক! এটা কিভাবে সম্ভব আমি জানি না। এমন উত্তুঙ্গ মনোযোগ নাটক দেখার, ভাই, তাহলে অডিয়েন্সে বসে জেম্বে বাজাতিস না হয়! না! উনি এদিকেই বসবেন, আর কলন্দর যখন রাজাকে জিজ্ঞেস করবে "তোমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা কী?", আমার সৌমিকের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, ও এখনও জানে না এর উত্তরটা! এই সেদিন, বই-চিত্রে নাটক চলছে, হঠাৎ মাঝমধ্যিখানে সৌমিক সাংঘাতিক জোরে ফিসফিস করে আমাকে বললো, "ঘুঙুরের জটটা ছাড়িয়ে দাও তো!" বলে ঝম করে ঘুঙুর আমার কোলে রেখে দিল। আমি তো হাত থেকে মন্দিরা-টন্দিরা ফেলে একাকার করে জট ছাড়াতে গিয়ে দেখি, যাহসালা, জট তো পড়েনি! তারপর তাকে আমি যত ইশারা করার চেষ্টা করি, ওরে জানোয়ার তাকা এদিকে, জট পড়েনি, ঘুঙুরটা নে, সৌমিক ততক্ষণে আবার দর্শক হয়ে কলন্দরে মগ্ন!
   
শেষ করবো সৌমিকের কণ্ঠের কথা বলে। ব্যারিটোন বা গাইবার মতো তথাকথিত মধুর কণ্ঠ না হলেও সৌমিকের কিছুটা ভাঙা-স্বর এবং উঁচু স্কেল ধরার প্রবণতা আমাদের কোরাসে খুব সাহায্য করে। সাধারণ কোরিক অংশ হোক, বা হারমনি হোক, সৌমিক এই দুই জায়গায় অনবদ্য। 
অনবদ্য … নয় যে জায়গায়, তা হলো স্বাভাবিক ডায়ালগে। সৌমিক তত্ত্ব দেয়, ও নাকি কথা বলার সময় গলার ওপর আলাদা জোর দেয় না। আমরা কেউই গলা নিয়ে তেমন কালোয়াতি করি না। কিন্তু ওই 'আলাদা জোর' না দেওয়ার ফলে সৌমিকের কণ্ঠ যে মাঝে মাঝে হঠাৎ চপল ভাদুড়ী বিটা ভার্শন হয়ে যায়, এটাই অন্য জগতে নিয়ে চলে যায় ব্যাপারটাকে। কলন্দরের প্রথম শো-তে সৌমিকের প্রচণ্ড রেগে আমাদের বলার কথা, "কী?! এখানে আপনাদের শো??" সৌমিক প্রচণ্ড রাগলো, তার চেয়েও বেশি ভুরু কুঁচকালো, তারপর জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে হঠাৎ বলে দিল, "শো?" আর সে যা গলার টেক্সচার! আমি আর মৈত্রেয়ী ওখানেই প্রায় "ভাই এই গলাটা কোত্থেকে বার করলি?!" তার অব্যবহিত পরে সৌমিক সোহমকে ফোন করে মিহি গলায় "রাজাদা রাজাদা" বলে এমন শোরগোল ফেলে দিল, যে তার পরের ডায়ালগ কখনই শো না করতে দেওয়ার মতো গম্ভীর বিষয় হতে পারে না, বড়জোর পালংশাকের বড়া খেতে না দেওয়ার মান-অভিমান সম্ভব।
   
আজ সৌমিকের জন্মদিন। বিকেলবেলায় সবাই মিলে বসে একটু গানগল্প হবে। যারা থাকবো, তো থাকবোই। যারা থাকবেন না, এই থ্রেডে উইশ করে দিন, অন দ্য কাউন্ট অফ থ্রী . . .!

Comments