জন্মদিন: নীলাঞ্জন
কলকাতা আমাকে রূপকথা উপহার দেয় সময়ে সময়ে।
৩রা মার্চ, ২০১৮। দুপুর ২টো তখন।
'নগরবাউল'-এর তৃতীয় শো শুরু হতে আর বড়জোর সাড়ে চার ঘণ্টা। নিয়মমতো আমার বাড়িতে একজোট হয়ে বাজনাপত্র নিয়ে যাওয়া বিকেলের দিকে। আমি তখন কলেজ থেকে ফেরার পথে, ট্রেনের অপেক্ষায় স্টেশনে ঝাঁঝাঁ রোদে দাঁড়িয়ে আছি। ফিরে কিছু কাজ তখনও বাকি -- লিফলেট লেখা, সব জিনিস গোছানো হলো কিনা, সেটা ক্রস-চেক করা, এ'সব। এমন সময় নীলাঞ্জনের ফোন।
"ব্যস্ত আছো?"
"ট্রেন ধরবো এবার। কেন, বল।"
"একটা ছোট্ট চাপ হয়েছে।"
"বল।" (বলে রাখা প্রয়োজন, আমাদের কাছে যেগুলো 'ছোট্ট চাপ', সেগুলো নীলাঞ্জনের কাছে হাহাহিহি-র পাত্র। কাজেই, নীলাঞ্জনের কাছে যেগুলো ছোট্ট চাপ, সেগুলো আমার-আপনার কাছে যে কী ...)
"আমি একটু হসপিটালে যাচ্ছি।"
আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হতে শুরু করেছে। তবু, যতটা পারি শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলাম, "কেন?"
"আমার তো আসলে IBS syndrome আছে। আজ সকাল থেকে ডায়রিয়া-র মতো হয়ে ডিহাইড্রেশন হয়ে গেছে বেশি। বাড়িতে চাপ হতে পারে, তাই হসপিটালে একবার দেখাই, যদি স্যালাইন দিতে হয়।"
"সঙ্গে কেউ আছে?"
"বাবা আসছে। চাপ নিও না। বলছিলাম যে, কোনো কারণে কন্ডিশন আরও খারাপ হলে, আজকের শো-টা একটু ম্যানেজ করে নিতে পারবে কোনোভাবে?"
নীলাঞ্জন না এলে শো কিভাবে 'ম্যানেজ' হবে, কিছুই বুঝতে পারলাম না। নগরবাউলের abridged version করে বেরিয়ে আসতে হবে হয়তো। তবু, এ সময়ে ওকে ব্যতিব্যস্ত করেই বা কী লাভ! বললাম, "তুই দেখা ডাক্তারকে। কী বলেন, জানাস। এদিকটা আমরা দেখছি।"
নীলাঞ্জনের 'ছোট্ট চাপ' ঘাড়ে নিয়ে গোটা ট্রেন বসে বসে ভেবে গেলাম, 'ম্যানেজ'টা করবো কী করে! নীলাঞ্জন নেই মানে অর্ধেক নগরবাউল ধূলিসাৎ। আর ততোধিক চাপ, এই খবরটা এখন আমাকে গিয়ে বিপ্রজিৎ আর সৌমিককে জানাতে হবে, তারা বাড়িতে বসে আছে গানবাজনা নিয়ে। এই সমস্ত সিচুয়েশন আমার জন্য রাখা থাকে। দলে কারুর এরকম 'ছোট্ট চাপ', 'খুচরো পাপ', নীলাঞ্জনের ডিহাইড্রেশন, শ্রেয়সীর টাইফয়েড, প্রথম ফোনটা আমাকে করে জানানো হয়। তারপর, আমি দলের বাকিদের "শোন, আসলে একটা ব্যাপার ... হলো গিয়ে ..."
বিকেল সাড়ে চারটে। নীলাঞ্জনের ফোন সুইচড অফ। আজ কী হবে, কেউ জানে না। অথচ বেরোনোর সময় হয়ে গেছে। স্পেসে গিয়ে বাকি কাজ সারতে হবে। দর্শক ডাকা হয়ে গেছে, এখন ক্যানসেল করারও সুযোগ নেই শো। টেনেটুনে আধঘন্টার একটা বিকট নাটক করতে হবে, খাপছাড়া। তাই-ই সই।
দরজা খুলে নীলাঞ্জনের প্রবেশ। চোখের সামনে নাটকটা এক ঘন্টার হয়ে গেল আবার। নীলাঞ্জন হাসলো, "চলো। স্যালাইনের কথা বলেছিল। আমি ORS খেয়ে নিয়েছি। চালিয়ে নেব। সমস্যা হবে না।"
বসন্তের কলকাতায় সেদিন তৃতীয়বার নগরবাউল। নতুন একটা দলের প্রথম প্রয়াস। থিয়েটারের মানুষদের জেদ, পাগলামির প্রচুর মিথ-হয়ে-যাওয়া গল্প শুনেছি। সেদিন থেকে নিজেও বলার মতো একটা গল্প পেলাম। নীলাঞ্জন, নগরবাউলের অপরিহার্য সেই সদ্যোজাত যুবক, সেই মুখোশধারী নির্দেশক, সময়ের সন্ত্রাসের সেই স্বর -- সেদিন বিকেল-সন্ধেয় আমাদের মনোভাব বদলে দিয়েছিল। দর্শক খুব বেশি হয়নি সেদিনের শো-তে, কিন্তু অল্প ক'জনের কাছেই অন্তর-রঙ্গ উজাড় করে দিয়েছিল নিজেকে।
যে অজস্র কারণে আমার নগরবাউলকে রূপকথা করে তুলেছিল এই কলকাতা, এটি তার একটি।
দেরি করে হলেও, শুভ জন্মদিন নীলাঞ্জন!
কলকাতায় ফিরে আয়।
Comments
Post a Comment