Followers

অন্তর-রঙ্গ'র কলকাতা

['অন্তর-রঙ্গ'র কলকাতা' লেখাটি ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে 'কলকাতা ট্রিলজি'র শেষ নাটক 'শূন্যসংকেত'-এর প্রথম উপস্থাপনার আগ দিয়ে ফেসবুকে ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল।]
 


ভাদ্রের বিকেলের রোদে সারাদিনে গড়া প্রতিমাখানি রেখে কুমারটুলির শিল্পীরা যান ঘন্টাখানেকের বিশ্রামে। জং ধরা রেলিংয়ের ওপারে ছুটে চলে যায় চক্ররেল। গঙ্গা আড়মোড়া ভেঙে নেচে ওঠে জোয়ারে।
   
একটা বয়সের পর আমাদের আর কোনোকিছুই নিকট থাকে না। বাঁধন আলগা দেওয়াটাই রীতি তখন। এক বাঁধন থেকে অন্য বাঁধনে পালানো নয়। রাগ নয়। বিরক্তি নয়। কেবল অবসন্ন সরে যাওয়া। যে-সময়ে মায়ায় বেঁধে রাখার মতো আর কোনোকিছুই হাতের কাছে পাওয়া যায় না, বেঁধে রাখলেও বাতুলতা বা হাস্যকর লাগে। সবসময়ই আটপৌরে আঁচল ছেড়ে যেন রোদ পালাই-পালাই।
   
এমন এক সময়ে আমাদের কজনের জীবনে সূত্রপাত অন্তর-রঙ্গ'র। সম্পূর্ণ বা প্রায় ভেঙে যাওয়া, গুমরে ওঠা একটা সময়ে কী নির্বিকার দাবী একসঙ্গে, এক সুতোয়, মায়ায় বেঁধে রাখার। শুধু বেঁধে রাখা নয়, নাম দিয়ে বেঁধে রাখা। যে সময়ে 'দল' বললেই তারপর 'বাজি' মনে পড়ে, সে সময়ে অন্তর-রঙ্গ এল, আমাদের সবার 'দল' হয়ে, ঘর হয়ে, বিনি-সুতোর বাঁধন হয়ে।
   
শুরু থেকেই অন্তর-রঙ্গ'র দাবী সামান্য। যে শহর তার ধাত্রী, তাকে বারবার দেখতে চেয়েছে নানাভাবে এই দল। অন্তর-রঙ্গ তার শৈশব ছেড়ে কৈশোরের দিকে পা বাড়িয়েছে, আর শেষ দু' বছরে অল্প অল্প করে বদলে গেছে তার কলকাতা। সাধের যে নগরকে ঘিরে একদিন সে বাউলাঙ্গের কথা-কাহিনী সাজিয়েছিল, সেই নগরই এখন চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল নিয়ে এক দুর্গম মেট্রোপলিস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে স্থির। মনে হয় তার হৃদয় গেছে, আর মগজেও ভ্রান্তির অসুখ। তবু অন্তর-রঙ্গ কেন জানি না সুখ খোঁজে এই শহরে। ১০০ বছর আগে ডাবলিনের অ্যারাবি থেকে বেরিয়ে আসা সেই হতাশ কিশোরের চোখে রাগের জোনাকি জ্বলে ওঠে, শহরের গোলমালের ভিড়ে চাপা পড়ে যায় প্রতিদ্বন্দ্বীর সিদ্ধার্থের মতো তার মনে-মনে বলে ওঠা "দেখো, আবার ফিরে আসবো!" অন্তর-রঙ্গ আবার, বারবার ফিরে আসে। নদীমাতৃক শহর নগরবাউলের উপর বিচ্ছেদের, মায়ার পলি জমাতে থাকে। দেখার চোখ, ভাষার ভঙ্গী বদলে যায়। 
   
পুজোর আগে ফিরছে অন্তর-রঙ্গ। কলকাতার উপর শেষ নাটক 'শূন্যসংকেত' নিয়ে। অনেক প্রস্তুতি, অনেক তোড়জোড়। বছর দুই হলো। কৈশোরে পা দিচ্ছে অন্তর-রঙ্গ। বয়ঃসন্ধির নানা ক্ষত দগদগে। প্রতিজ্ঞাও। আমাদের মুখচোরা দল বড় হচ্ছে। 
   
শিল্পীরা বিশ্রামে গেছেন প্রতিমার আদল ফেলে রেখে। ট্রেনের শব্দে, গাড়ির শব্দে, গঙ্গার শব্দে কি যেন, কি যেন বলার ছিল আরও, ভুলে যাই ... 



আমাদের তিনতলা বাড়ি। তার একতলার সামনের ঘরটা শেষ দু' বছর যাবৎ অন্তর-রঙ্গ'র। ১৯৮৪ সালে ঠাকুরদা যখন কিনেছিলেন বাড়িটা, তখন কোনোমতে একতলার উপর দোতলা দাঁড়িয়েছিল, আধগড়া। তারপর একটু একটু করে তৈরি হয় দোতলার ঘরগুলোর পোক্ত দেওয়াল, জানলায় গ্রিল বসে। দোতলার নেড়া ছাদে পাঁচিল ওঠে। তারও অনেকদিন পর তিনতলা গড়েন বাবা। আমাদের বাড়ি মোটামুটি স্থবির। একবার যে ঘরে কিছু একটা রাখা হয়, সহজে নড়ে না। বসার ঘর, খাওয়ার ঘর জন্ম থেকে একই দেখছি। শুধু বারবার বদলেছে একতলার এই সামনের ঘরের দায়িত্ব। কখনও শোবার ঘর, কখনও সে আমার পড়ার ঘর। অঙ্ক স্যার এই ঘরে আমায় অঙ্ক করাতেন বলে আমার ঘরটার উপরেই সাংঘাতিক রাগ ছিল। সচরাচর ঢুকতাম না এই ঘরে। তিনতলা হওয়ার পর বাড়ির যত পুরোনো আসবাব, তার গুদামঘর হলো এটি। 
   
অবশেষে, ২০১৭-এ সব ঝেড়েঝুরে একটা ছোট্ট খাট পাতা হলো। কিছু চেয়ার। একটা গোল টেবিল। বিপ্রজিৎ সেই ঘরে এনে রাখলো গীটার। তালবাদ্যের অভাব ছিল বলে খাটের একদিকের চাদর তুলে তক্তা বাজানো হতো। সেই ঘরে ফি-সন্ধ্যায় আলো জ্বেলে বসতে শুরু করলাম আমরা ৬-৭ জন। তখনও 'অন্তর-রঙ্গ' নাম হয়নি। কেবল ভেবেছি, এই যে আমরা বসছি, এখান থেকে একটা দল উঠে আসবে। বাইরে দিয়ে রিকশার ভেঁপু, রয়্যাল এনফিল্ডের গর্জন, গাড়ির হর্ন অনর্গল আমাদের নিভৃতি ভেঙে দিয়ে যেত, যায়, আজও। যতদিন না বুঝলাম, নিভৃতি নয়, শহরের গোলমেলে চলনেই আমাদের মুক্তি। সোহম বললো, মুক্তি-টুক্তি কিছু না, আসলে এ সবই 'অন্তর-রঙ্গ'। আমরা ঘাড় নাড়লাম। বেশ নাম হয়েছে। গেট দিয়ে ঢুকে প্রথমেই শুনবেন গান, বা জোরে জোরে স্ক্রিপ্ট পড়ার আওয়াজ। হা-হা হাসি। তর্ক। ফাজলামি। আমাদের ছোট্ট পাড়ার প্রথম নাটকের দল, 'অন্তর-রঙ্গ'। ঠিকানা, একতলার প্রথম ঘর।
  
তবে কখনও কখনও একতলা ছেড়ে আমরা উঠে যেতাম তেতলার ট্যাঙ্কের ছাদে। বিকেল হয়ে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। বিপ্রজিৎ, আমি আর সৌরভ বসে আছি সেই ছোট্ট ছাদে। গীটার আর একটা খাতা-পেন নিয়ে। আমাদের সাধ জেগেছে, রাস্তার থেকে একটু দূরে, সন্ধের মুখে আমরা মুখে মুখে গানের কথা, আর হাতে হাতে গানের সুর তৈরি করবো। শিল্পীর স্বভাবসিদ্ধ ভাবগম্ভীর স্বরে বিপ্রজিৎ বলে, "এই আলোয়, এই সন্ধের মুখে, এই স্কাইলাইন দেখে, এই দূরের আওয়াজ যেটুকু ভেসে আসছে সেটুকু শুনে তোমাদের দুজনের যা যা শব্দ মনে আসছে, এক এক করে বলতে থাকো তো। কোনো ছন্দ, মিল ভাবার দরকার নেই। আগে কিছু শব্দ আসুক। তারপর দেখি সুর আসে কিনা।"
  
সৌরভ একটুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে বলে, "আঁধার।"
তখন আঁধার নয়। আঁধারের মুখ। সৌরভ কেন আঁধার বললো জানি না, কিন্তু মনে হলো "অন্ধকার" বললে বোধ হয় এতটা ঘন কালো মনে হতো না চারপাশ। "আঁধার"। আলো চলে গেছে যেন।
দূর থেকে কানে আসে সন্ধের আজান। তাকে কেটে দিয়ে ট্রেনের হর্ন ছুটে চলে যায় শিয়ালদা'র দিকে। আমি বলি, "পথ চলা"। বিপ্রজিৎ গীটার তুলে নেয় হাতে। একটা ধুন ধরে। কথা বসায় না। শুধু গুনগুন করে একটা সুর। সময় এগিয়ে যায়। দূরে সাউথ সিটির আলোগুলো কী সাধারণ খুশিতে জ্বলছে। তার ওপারে গল্ফগ্রিন টিভি টাওয়ারের আলো। আশেপাশের ছাদ ফাঁকা। আমার গায়ে কাঁটা দেয়। কেউ দেখছে না, সন্ধের ছাদে একা-একা তিনটে ছেলে বসে গান বানাচ্ছে, কেন জানে না। হাতে কোনও নাটক নেই। অথচ নাকি নাটকের দল! "একা", আমি বলি। বিপ্রজিৎ নীরবে সম্মতি জানায়। ধুন বেজে চলে। সৌরভ পরপর তিনটে শব্দ বলে, আঁধার থেকে উদ্ভূত। "নদী", "মিথ্যে", "ঘর"। তবুও কথা বসে না সুরে। আরও কিছু চাই। নিশ্চিত আরও কিছু প্রয়োজন। 
হঠাৎ, প্রায় নিজেকেই চমকে দিয়ে আমি বলি, "সন্তান"। বিপ্রজিৎ থামে।
  
"কেন? সন্তান কেন?"
"তুই তো 'কেন' ভাবতে বলিস নি!"
"বেশ। এগোক।"
  
এরপর সৌরভ "শহর" আর আমি "দাগ" বলার পর আমরা নিচে নেমে আসি আমাদের ঘরে। বিপ্রজিৎ বলে, "শুভংকর দা, তোমরা যে অর্ডারে কথাগুলো বলেছো, একবার লিখবে খাতায়?"
  
লিখলাম। 
   
"আঁধার … পথ চলা … একা … নদী … মিথ্যে … ঘর … সন্তান … শহর … দাগ।"
   
শব্দগুলোর দিকে আমরা বাকি সন্ধে তাকিয়ে বসে থাকি, ম্যাজিকের অপেক্ষায়। কোনও গান যদি আসে। বিপ্রজিৎ অক্লান্ত গেয়ে চলে কথা ছাড়া সেই ধুন। গান আসে না। সেই রাতে, শব্দগুলো নিয়ে আবার বসি আমি। লেখার চেষ্টা করি।
  
"দিশাহারা পথ চলে আঁধারের সন্তান,
একা একা ঘর করে আঁধারের সন্তান।
  
নদী যায়, মন যায় শহরের প্রান্তে,
আঁধার ঘিরে ধরে একা একান্তে।
  
ব্যথাদাগ, অনুরাগ, পড়ে পাওয়া মিথ্যে
এখনও অনেক কিছু বাকি ছিল জিততে।
   
এইভাবে কত ঘরে আঁধারের সন্তান
রাত্রির কথা বলে আঁধারের সন্তান।"
   
অন্তর-রঙ্গ'র প্রথম গান। বিপ্রজিৎ সুরে ফেলে দেখে, মিলে যাচ্ছে। পরদিন আব্দার আসে, "এই গানের উপর একটা নাটক লিখতে পারবে?"
   
প্রায় অসম্ভব এক আব্দারের নাম 'নগরবাউল' -- অন্তর-রঙ্গ'র প্রথম নাটক। লেখা হয় এর মাসখানেক পর, অগাস্টের শেষ সপ্তাহে। নগরবাউলের একটা ছোট্ট গান 'আঁধারের সন্তান', কেবলমাত্র একতারার সঙ্গতে গাওয়া। আলো থেকে অন্ধকারে যাওয়ার মুখে তৈরি হয়েছিল এর সুর, কথা। নাটকে, অন্ধকার থেকে আলোর পথে, ছন্নছাড়া জীবন থেকে ঘরের পথে, উত্তরণের গান হয়ে উঠলো সে।

আজ থেকে অনেক বছর পর আবার যদি কোনোদিন নগরবাউল হয়, হয়তো তখন এই আমরা আর সমক্ষে থাকব না। কিন্তু যারা থাকবে, তারাও যেন ঘর হয়ে, বেঁধে বেঁধে থেকে নগরবাউলকে ভালোবাসে। এটুকুই চাওয়া।
    
***************
  
নগরবাউলের সর্বস্ব জুড়ে আছে এক শহর, আর তার বর্তমান বা অদূর ইতিহাসের নানা জলছবি। আছেন নীললোহিত, কবীর সুমন, এমনকি রবীন্দ্রনাথ। আর আছি আমরা। মানে, দলের আমরা নই শুধু। যাঁরা এই নাটক দেখেছেন বা এই লেখা এখন পড়ছেন, তাঁরাও। 
   
তিনতলার ছাদ আর একতলার সামনের ঘর জুড়ে আমাদের দিনগুলো কেটে যায়। ঘরে বসে বলা ছোটোখাটো কথা জুড়ে জুড়ে তৈরি হয় সংলাপ, ছাদের গল্প জুড়ে জুড়ে তৈরি হয় একটা গোটা দৃশ্য। আর আমাদের বারবারই মনে হতে থাকে, অন্তর-রঙ্গ'র কলকাতা আসলে কোনও ইঁট-বালির শহরের কাহিনী নয়। সে বড়জোর এই কলকাতা শহরে একসঙ্গে দিন কাটানো কিছু মানুষের, কিছু মনের যাপনকাব্য। কাব্য। নাট্য নয়। নগরবাউল এক দীর্ঘ কবিতা, যাকে আমরা 'behave' করেছিলাম। আর সেটুকুই কলকাতা ট্রিলজির মূল কথা। যা তোমার, তা তোমার অভিনয় হবে কেন? সে তোমার স্বভাব। 
   
রোদে জলে আমাদের দিনগুলো এগিয়ে যায়। একতলার ঘর আর তিনতলার ছাদের মাঝে আমাদের নানা স্বভাব, অভ্যাস, যাপন খুঁজে নিই আমরা, এই আঁধারের সন্তানেরা। আমাদের স্বপ্ন, দুর্ভাবনা, ভালোবাসা, অভিমান, সখ্যকে বেঁধে নিতে থাকি আমরা গানে, গল্পে, কথায়। অসামান্য এক আব্দারের পিঠে কাঠামো গড়ে ওঠে। একতলা, দোতলা, তিনতলা।



নগরবাউলের প্রথম শো দেখতে এলেন সাত্যকি দা। ১০১-২ জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, কথা বলতে পারছেন না, টনসিল ফুলে একাকার। অথচ নাটক শুরুর আধ ঘন্টা আগে চলে এলেন। ঘরে এসি চলছে। তার মধ্যেই বসে রইলেন এক ঘন্টার উপর, একদম পিছনের সারিতে, একটা চেয়ারে। পুরো নাটক দেখলেন। শেষ হওয়ার পর এগিয়ে এসে বললেন, "খুব ভালো লেগেছে, কিন্তু এর চেয়ে বেশি বলার অবস্থায় নেই। শরীরটা ঠিক লাগছে না। আজ আসি?" চোখ লাল জ্বরে। আমার অসহায়ভাবে ঘাড় নাড়া ছাড়া আর কীই বা করার ছিল! একটু এগিয়ে দিতে গেলাম, বললেন, তুমি একদম আসবে না। ওদিকে এত লোকজন, যাও সামলে নাও। বাধ্য ছেলের মতো ফিরে এলাম। রাতে নিজে থেকেই আবার মেসেজ করলেন, "অনেকক্ষণ থাকার ইচ্ছে ছিল আজ। পারলাম না। খুব ভালো কাজ হয়েছে।"
   
আনন্দে-অনাদরে আত্মীয়তার হাত বাড়িয়েই রাখে কলকাতা, তার মানুষে, তার ফিরিয়ে দেওয়ায়। কোনো কোনো উপস্থাপনায় দর্শক বেশ কম হয়েছে। বেশিরভাগ আসনই ফাঁকা। তবু কিছু মানুষ এসে বসেছেন শূন্য ঘরে, আমাদের অপেক্ষায়। আমরা যখন নাটকে হাসির মুহূর্ত তৈরি করেছি, তারা হেসেছেন; উদ্বেগের মুহূর্তে পিঠ টানটান করে বসেছেন; দুঃখের মুহূর্তের অভিনেতাদের চোখে চোখ রাখতে না পেরে সরিয়ে নিয়েছেন। তাঁদের উল্টোদিকে বসে আমি শুধু এটুকুই লক্ষ্য করে যাই শোয়ের পর শো। মানুষের সাধারণ চাহিদা, আশঙ্কা, অভিব্যক্তি। সেটুকু দিয়ে আমরা ভরিয়ে রাখি নিজেদের। মানুষের চোখের দিকে তাকালে এখন বুঝতে পারি, আজকের উপস্থাপনা ভালো হবে না খারাপ। তাদের সামান্য হাসি চাপার শব্দ, বা আড়চোখে ঘড়ি দেখে নেওয়া আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায় ভালো, বা খারাপ। সাত্যকি দা'র মতো ধুম জ্বর নিয়ে হয়তো সবাই নাটক দেখতে আসেন না, হয়তো অনেকের দেরি হয়ে যায় পথে, হয়তো অনেক পিছুটানে অনেকে আটকে পড়েন। কিন্তু এও জানি, যাঁরা আসেন, তাঁরাই আমাদের শিক্ষক। অনুষ্ঠানের শেষে হয়তো নীরবে বা দুয়েকটা কথার শেষে তাঁরা বেরিয়ে যান। কিন্তু আমি চোখ পড়ি। অনেকের নীরবতায় শুনি, "অনেকক্ষণ থাকার ইচ্ছে ছিল আজ। পারলাম না।"
   
আমাদের রিহার্সাল রুম বিশেষ বড় নয়। তার উপর খাট, খানকয়েক চেয়ার, একটা ছোট টেবিল, মোড়া এবং নাটকের মালপত্র রাখার সুবাদে দিন-কে-দিন সে ঘর আরও ছোট হচ্ছে। এর মধ্যেই অভিনয়-চর্চা হয়। মৈত্রেয়ী তার টিম নিয়ে নাচের স্টেপ ঠিক করে। সৌমিক এসেই তালবাদ্যের সরঞ্জাম নিয়ে নিজের জায়গায় বসে যায়। এরই মাঝে চা আসে, সকলে মাটিতে ছড়িয়ে বসে চুমুক দিই। বিপ্রজিতের গলাব্যথা হলে ওর জন্য দু'কাপ চা বরাদ্দ। এই সবের মধ্যে মৈনাকের জন্য ঘরে রাখা ৪ ফুট/ ৫ ফুটের একটা ছোট্ট জায়গা, পাশের ঘরে যাওয়ার দরজার গায়ে, অন্ধকার মতো। এদিকে শূন্যসংকেত নিয়ে তাণ্ডব চলতে থাকে। চায়ের কাপে তর্কের আয়লা, ফণী সব আছড়ে পড়ে। একে অন্যের উপর রেগে যাওয়া। একের পর এক আবহের কম্পোজিশন। অলক্ষ্যে, প্রায় নীরবে মৈনাক তৈরি করে চলেছে একের পর এক সামগ্রী, আর্টওয়ার্ক, ডিজাইন। তার একটুও বেশি জায়গা লাগে না, কম চিৎকার হলে যে কাজ করতে বেশি সুবিধা হতো এমন মনে হয় না, কেউ যদি মৈনাককে বলে দেওয়ালের ভিতর ঢুকে গিয়ে কাজ করতে, মৈনাক বোধ করি তাও করে দেবে। কাজ শেষ হলে ডেকে দেখায় একবার। রঙ-তুলি গুছিয়ে নিতে থাকে। ফেরার তোড়জোড় করে। আমার কেবল মনে হয়, মৈনাকের থেকে শেখার এই একাগ্রতা।
   
এখন, পিছনে তাকালে মনে হয়, নগরবাউলে অভিনয় করা শুধু পারফরমেন্স ছিল না। নগরবাউলের প্রত্যেকটা পাতায়, শব্দে, নীরবতায়, গানে, হাসিতে ছিল গোটা পাঁচ-সাতেক মানুষের একটা দল গড়ার আপ্রাণ চেষ্টা। ডিজাইন বলুন, বাঁধুনি বলুন, সবদিক দিয়েই নগরবাউল তথাকথিত নাট্যরূপের বিরুদ্ধগামী। সব উপস্থাপনায় আমাদের অভিনয় যে দুর্দান্ত হতো, তাও নয়। কিন্তু যেটুকুই যা হতো, তাতে নিজের প্রতি নয়, অভিনয়ের প্রতি নয়, গল্পের বা গানের প্রতি নয়, একটা দলের প্রতি যে দায়বদ্ধতা দেখা যেত, তার সাক্ষী আছে কলকাতা। শিয়ালদা নর্থ সেকশনে ট্রেনলাইনে অবরোধ। শোয়ের আগে ফাইনাল রিহার্সাল। ট্রেনের জন্য অপেক্ষা না করে, "আসতে পারছি না" না জানিয়ে দু-তিনবার বাস-মেট্রো করে এসে পৌঁছেছে দলের জন্য কেউ। আর কেউ যাদবপুরের পরীক্ষার প্রাণান্তকর চাপ মাথায় নিয়ে সারাদিন পড়া সামলে, রাত জেগে সামাল দিয়েছে স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করা। নীলাঞ্জন কাজের চাপে দিন-রাত গুলিয়ে ফেলতো এক এক সময়। তখন ওর ঘুমোনোর জায়গা ছিল আমার বাড়ির এই ঘর। রিহার্সাল হতে দেরি হলে যেটুকু সময় পাওয়া যায়, বা রিহার্সালের পর কাজে যাওয়ার আগের সময়টুকু। সোহমের মতে, স্ক্রিপ্ট মুখস্থ এই জায়গায় যাবে যেন দেখা হলে একে অন্যের সঙ্গে নাটকের কথাই দৈনন্দিনভাবে বলতে পারি। সে কথাকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে নীলাঞ্জন শেষদিকে শ্রেয়সীকে দেখলেই বলতো, "তাহলে সোয়া ছটা নাগাদ দেশপ্রিয়। দেরি নয় যেন!"
- উফ দাঁড়া! পথঘাট তো ভেসে গেছে! আর এই বাসটাও ধুঁকছে!
- (নীলাঞ্জন, আমাকে) এদিকে হৃদয়ের কলকাতায় আজ বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি …
   
এদের সবাইকে দেখে আমি শিখেছি 'দল' কথার অর্থ, যা অভিধানে নেই। কেউ দল-দল করে চেঁচিয়ে মাৎ করেনি, কিন্তু প্রত্যেকে দলের যে বসত, তাতে এনে রেখেছে পাখিদের মতো খড়কুটো, ঘর বাঁধার আশায়। 
   
আর এই সবের ঊর্ধ্বে আমাদের নিত্যদিন শিখিয়ে পড়িয়ে গেছে কলকাতা। নাটকের গল্পের যে রাস্তাঘাট, বাড়ি, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান, সব এই শহরের বুক থেকেই খুঁজে পাওয়া, তুলে নেওয়া। গৌরবের সঙ্গে কোনোসময়ে হাঁটতে গিয়েছিলাম হরিশ মুখার্জি রোড ধরে ভবানীপুর এলাকা, দেখেছি ভরদুপুরেও ঝিম মেরে আছে আদিগঙ্গায় যাওয়ার রাস্তাগুলো, বাড়িগুলো ২০০ বছরের ইতিহাসে নুয়ে পড়েছে বৃষ্টি-পাওয়া গুল্মের মতো। ঈপ্সিতার সঙ্গে গিরীশে নাটক দেখে ফেরার পথে একদিকে দিয়ে চক্ররেলের ডাক আর অন্যদিকে ট্রামের ফেরা আমাদের মাথায় সুর বাজিয়ে তুলেছে; আনন্দে আমরা বাড়ি না ফিরে চায়ের দোকান আবিষ্কার করে বেড়িয়েছি উত্তর কলকাতায়, যেখানে আর হয়তো অনেকদিন আসবই না। বিপ্রজিতের সঙ্গে বাসে করে যাচ্ছি কোথাও, হঠাৎ সে বলে উঠলো, "রবীন্দ্রনাথের গান কি শুধু হলঘরে মাইকে গাইবো নাকি? ফাজলামি হচ্ছে?" কে ওকে হলঘরে মাইকে গাইতে বলেছিল কে জানে! কিন্তু ও দাবী করলো, এক্ষুণি এই বাসে রবীন্দ্রনাথের গান সম্ভব। লড়ঝরে সরকারি বাস ছুটছে। বিপ্রজিৎ বেপরোয়া ড্রাইভারের হর্ন ছাপিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ধরলো, "দেখা না দেখায় মেশা …", যাত্রীরা অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে এক যুবক ২০১৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত গাইছে।
   
এসব দেখে আমার ভারি মনখারাপ হয়, কলকাতা। তোমার জন্য নয়, নিজের জন্য নয়। বরং তাদের জন্য, যারা তোমায় ছেড়ে চলে গেল। যারা শুনলো না, যে শহরে আজ আর কিচ্ছু হয় না, সেখানেও কেউ রবীন্দ্রনাথ গায় একরাশ লোকের তোয়াক্কা না করে। যারা জানলো না, আজও রোজ বিকেল পাঁচটায় আদিগঙ্গায় জোয়ার আসে, ঘাটের সব সিঁড়ি ডুবে যায়, শ্রাদ্ধের সরার ভাত কাক খেয়ে যায়, কিন্তু দুর্ভাগ্য, তা দেখার কেউ থাকে না। তোমাকে আমার ভারি আদর করতে সাধ জাগে, কলকাতা, কলকাতা -- আমার নিভে আসা মাধুরীবিলাস, আমার খালি বলতে ইচ্ছে হয়, তোমাকে আমরা অনেকেই বুঝি নি। কিন্তু তুমি তো আমাদের বুঝেছো, বলো? যারা তোমাকে ফেলে পালালো, যারা বললো তোমার আর কিছু বাকি নেই, যারা দূরে গিয়ে বললো, তোমার জন্য মনকেমন করে, আমরা এই কজন তাদের সব কথাকে সত্যি ধরে নিয়েও তবু তোমার কাছেই রয়ে গেছি, কলকাতা! প্রতিদিন, প্রতিরাত জাগরণে তোমার স্বপ্ন এসেছে বা ঘুমের মধ্যে জেগে উঠেছো তুমি, আর যেটুকু যা বলতে চেয়েছো আমাদের, তার সবটাই লিখে রেখেছি অন্তর-রঙ্গ'র সব আহাম্মক প্রচেষ্টায়। কারণ, সত্যি বলতে কি, আমরা এত কিছু চাইনি কোনোদিন। একসঙ্গে হয়েছি যখন, যৌথতা চেয়েছি। একা হয়েছি যখন, জেনেছি পৃথিবীতে আর একজন অন্ততঃ একা --- সে কলকাতা। জীবনানন্দ বাংলার মুখ দেখেছেন, কিন্তু আমি তোমার মুখ দেখিনি কখনও। কারণে-অকারণে অজুহাতের অভাব নেই তোমার, মুখ আড়াল করো তুমি দু'হাত দিয়ে, আমার শহর। বড়জোর বহুদূরে বসে কখনও আমি খবর পেয়েছি, তোমার আকাশে মেঘ করেছে আজ। আর আমার খালি মনে হয়েছে, এই দল ঘর হয়ে উঠুক।



নবমীর দুপুর-বিকেল। উত্তর কলকাতা। হাতিবাগানের 'আরসালান' থেকে ভুরিভোজ সেরে বেরিয়ে আবার পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছি আমরা ক'জন বন্ধু। একটা প্যান্ডেলের সামনে বেজায় জোরে মাইক বাজিয়ে, মঞ্চ করে কিসব সংস্কৃতি হচ্ছে। তার মাঝেই চোখে পড়লো, মঞ্চের একপাশে খয়েরি কাপড়ের উপর পিন দিয়ে আটকানো একটা সাদা কাগজ। তাতে কালো দিয়ে লেখা --
   
"নবমীতে নেই নীললোহিত।"
  
ভাবলাম, সন্ধেবেলা যে নাটকটা হবে, নিশ্চয়ই তার নাম। ভাবতে ভাবতেই ফোন আরেক বন্ধুর। "শুনেছিস?"
"কী শুনবো?"
"সুনীল গাঙ্গুলি নেই।"
  
তার পরের ক'দিন টিভিতে আর কাগজে "নীললোহিত চলে গেলেন দিকশূন্যপুরে", "নীরা আজ বড় একা", "মন ভালো নেই", "সুনীলও কথা রাখলেন না", "চিরন্তন সাতাশের যুবক ঘুমের দেশে", প্রভৃতি অসহ্য হেডলাইন এল-গেল। আমার তবু মনে রয়ে গেল ওই প্রথম কথাগুলো। শারদীয়া নবমী। বিকেল পৌনে চারটে। খয়েরি কাপড়। পিন দিয়ে আটকানো। সাদা কাগজে লেখা ভালোমানুষের মতো মৃত্যুসংবাদ, "নবমীতে নেই নীললোহিত।" পুজোর শেষলগ্নে কান ফেটে যাচ্ছে শব্দব্রহ্মে, আলোর রোশনাই ধাঁধিয়ে দিচ্ছে চোখ, মানুষের ঢল চব্বিশ ঘন্টা; এত কিছুর মাঝে একজন কলম-ধরা মানুষ নিভে গেলেন কলকাতায়। মৃত্যু স্বাগত নয় হয়তো কখনই। তবে মৃত্যু অভাবনীয়ও নয়। কিন্তু কেন জানি না, সুনীলের মৃত্যু আমার আজও অবিশ্বাস্য লাগে। মানুষটির সাজ, চলন, বলন, লেখনী কিছুতেই যেন মৃত্যু উচ্চারিত হয়নি কখনও। একবারই এল সে, আর মানুষটাকেই নিয়ে গেল।
   
প্রায় পাঁচ-সাড়ে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। বন্ধু বদলে গেছে। পৃথিবীও। অন্তর-রঙ্গ তখন এক নবজাতকের নাম। তার প্রথম নাটকের বিষয় কী হবে, এই নিয়ে চুলোচুলি চলছে আমাদের। প্রতি সন্ধ্যারই রেজলিউশন হচ্ছে "ধুর! যত্তসব ফালতু আইডিয়া!" 
   
এই সময়ে নীললোহিত ফিরে এলেন আমাদের দলে। এতদিন যে নাটকের উদ্দেশ্য খোঁজা হচ্ছিল, যে গল্প বলবো, তার প্রয়োজনীয়তা, মান্যতা বিচার করা হচ্ছিল, সব নিশ্চিহ্ন করে দিলেন সুনীল। তাঁর লেখা ধরেই আমাদের মনে হতে থাকে, কলকাতায় ক'জন মানুষ উদ্দেশ্য নিয়ে ঘুরে বেড়ায়? বরং আমাদের চরিত্র হোক তারা, কলকাতা যাদের নিরুদ্দেশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, সময়ের মতো কলকাতা দিয়ে যারা বয়ে যায়; যারা দ্যাখে সবই, কিন্তু প্রকাশ্যে নয়, বরং এক অবিচ্ছিন্ন অন্তর্কথনে সে'সব ধরে রাখে, তারা। সে পথ নীললোহিত দেখিয়ে গেছেন আমাদের গল্পে, কিন্তু বাস্তবের দোহাই দিয়ে আমরা সে-সব ঢেকে রেখেছি। এখন, আজ, এই এক্ষুনি, কেমন হয়, যদি নীললোহিতের চর্যা হয়ে ওঠে শহরের পথ-চলার গল্প? এক নগরবাউলের জবানি, যার উদ্দেশ্য নিরুদ্দেশ, বিধেয় কলকাতা।
   
নগরবাউলের তথাগত বা সেমন্তীর গল্পে নীললোহিত আমাদের নির্দেশক ছিলেন বটে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তথাগত বা সেমন্তীর গল্প আরও বেশি আমাদের নিজস্ব হয়ে উঠেছে, আর নীললোহিত ছড়িয়ে পড়েছেন আমাদের বোধে। তথাগত বদলে যেতে যেতে নিয়েছে সম্পূর্ণ নতুন এক রূপ। সেমন্তী হারিয়ে গেছে। কিন্তু নীললোহিত হারান নি। শক্তির মৃত্যুর পর যেমন সুনীল মধ্যরাতে কলম নিয়ে বসলেই মাথার মধ্যে অনর্গল ডাক শুনতেন, "সুনীল, আমিও লিখছি না, তুমিও লিখবে না", তাঁর মনে হতো মাথার ভিতর দপদপ করছে আগুন, তেমনই আমাদের কাহিনী হয়ে, ভঙ্গী হয়ে, শেষে আমাদের যাপন হয়ে ওঠেন নীললোহিত। 
  
সুনীলের গল্পের সেই পাহাড়ের মতো হৃদয়ের ছোট ছোট মানুষদের দলেই আমরা। মুক্তি নেই, তাই ভালো আছি। অসুস্থতার তোয়াক্কা না করে নাটক করতে চলে আসে নীলাঞ্জন; বা রাত পৌনে দশটায় হঠাৎই দরজায় বেল বাজতে দেখি, সে দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত কাজের শেষে, "একবার আমার ডায়ালগগুলো বলবো। একটু শুনে নেবে?" বিপ্রজিৎ আমার কবিতাগুলো নিয়ে রাতদিন বসে বসে সুর ভাবে। চা আসে, ঠাণ্ডা হয়ে যায়। মহীনের ঘোড়ার দল, সুমন, লালন সবাই হুড়মুড়িয়ে কখনও কখনও এসে পড়ে ওর মাথায়। তাদের ভালোবেসে আমিও লিখি, "হৃদয়মাঝে দিকশূন্যপুর"। সৌমিক আপাদমস্তক শান্তশিষ্ট মানুষ, নিচু স্বরে কথা বলা। কিন্তু বিপ্রজিৎ সুর ধরলে ও বসে জেম্বে নিয়ে, চোখ বন্ধ করে নেয়; মগজ হাতকে নয়, হাত মগজকে চালায়। অপ্রকৃতিস্থ সেই বাজনা কলকাতার কোমরবন্ধনীতে হাত রাখে, তার বুক ছুঁয়ে দ্যাখে, ঠোঁটের উপরের ঘাম মুছে দেয়, আবার ঈশ্বরীজ্ঞানে পা ছুঁয়ে প্রণামও করে। সমুদ্রনীল এক মধ্যবিত্ত রাজার পরাজয় আর প্রত্যয়ের মধ্যে মেঘ হয়ে বাস করে, অবাস্তব এক কলন্দরের সম্মুখে নত হয়ে যেন শহরেরই গর্ভে শুয়ে থাকে ভ্রুণের মতো। 'কথা যদি ফুরোবেই শেষে'তে শ্রেয়সী খুঁজে পায় গঙ্গার প্রবাহ, মেঘনা খুঁজে পায় পাখির উড়ে যাওয়া, ঈপ্সিতা আমার পাশে বসে কেবল বলতে চায় -- এসব রূপক মাত্র। আসলে নগরবাউল হয়তো তখন অন্যত্র। "পৃথিবী যে নিয়মে চলছে, সে ঠিক সে নিয়মে চলে না।"
   
নিয়মে না-চলার গল্প বহু। সে-কথা বলতে গেলে সকাল হয়ে যাবে। সে আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য আমার দলের মতোই -- নিরুদ্দেশ। কলকাতার সোজা-ঘুরপথে কুড়িয়ে বাড়িয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতার ঝুলি উপুড় করে দেখা মাঝেমাঝে, কতটা জমলো, আর কতটা হারালো। সে হিসেব অর্থহীন ও নিরন্তর, কারণ কলকাতা আমাকে, আমার দলকে যা দিয়েছে, তাকে হিসেবে বাঁধার ধৃষ্টতা নেই আমার। এতদিন পথের কথা, ছাদের কথা, ঘরের কথা বলছিলাম। আজ স্বাদবদল করে বললাম অন্য কিছু। ধরা যাক, নীললোহিতের কথা। কলকাতার আধুনিক ইতিহাসের নানা নগরবাউল আর কলন্দরদের কথা। নিয়মে-না-চলা কিছু জীবনের খুচরো প্রভাব। নিয়মে চলা মূলস্রোতের বিপরীতে খড়কুটো বাঁধার চেষ্টা। নবমীর বিকেলে হারিয়ে যান নীললোহিত। তবু রবীন্দ্রনাথ স্মিত হেসে লিখতে পারেন আমার এই বাংলা ভাষায়, "ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে"…



শূন্যসংকেতের প্রস্তুতি শেষ। আগামীকাল এমন সময়ে দর্শকদের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতও শেষ হয়ে যাবে। কখনও কখনও একটু বিহ্বলই করে দেয় এমন ভাবনা। নাটক 'হয়' না। নাটক 'গড়ে ওঠে'। কয়েকজন মিলে একটা নাটক গড়ে তোলার অনুভূতি একটা কবিতা বা গল্প লেখা, বা একটা গানে সুর দেওয়া, বা ক্যানভাসে একটা ছবি আঁকার অনুভূতির চেয়ে আলাদা। মতের চেয়ে মতান্তর অনেক বেশি এই গঠনে, মিলের চেয়ে বেশি বিরোধ। অথচ, এত কিছুর পরেও সব যখন কোথাও গিয়ে মিলে যায় একে অন্যের সঙ্গে, মনে হয়, এ যেন আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল কেউ। নাটক হয়তো এ জন্যই আলাদা, কারণ সে হাজার বিরুদ্ধতাতেও যৌথতার কথা বলে। 
   
একাকী এক শহর আমাদের এই কলকাতা। সেই শহরের বুকে দাঁড়িয়ে যৌথতার কথা কতদিন বলবো জানি না। প্রতিকূলতা অনেক, হেরে যাওয়া অগুনতি। অন্তর-রঙ্গ শেষ দু' বছর ধরে সেই অপ্রাপ্তিই ভরে নিয়েছে তার দুই হাতে। তারপর সেই অনিশ্চিত ধুলোবালি হাওয়ায় ধরে রেখেছে, বয়ে গেছে সব, আর শেষে গিয়ে আমাদের মনে হয়েছে শূন্য হাতই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তির ভাঁড়ার। 
   
এখনও মনে পড়ে, নগরবাউলের প্রথম উপস্থাপনার আগের দিন সন্ধ্যায় অনেকক্ষণ আমরা রিহার্সাল রুমে বসেছিলাম। রিহার্সাল থেমে গিয়ে কথার উপর কথা, গল্পের পিঠে গল্প চলছিলো। বাড়ি যেতে চাইছিল না কেউ, কারণ গেলেই প্রথম শোয়ের ভয় চেপে ধরবে। তবু, এক সময় তো যেতেই হয়। সবাই চলে গেলে একা রিহার্সাল রুমে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সরঞ্জাম। একটা নতুন নাটকের দল। শোয়ের আগের দিন সব ঠিকমতো গুছিয়েও রাখতে শিখিনি আমরা তখনও। আমাদের চিন্তার মতোই এলোমেলো আমাদের ঘর। বাইরে, কলকাতায় রাত নামছে। বিপ্রজিৎ মেসেজে লিখে পাঠালো, "কাল থেকে আমাদের সন্তান আর আমাদের নয়। সবার। আজ, এই রাতটা, তাকে যতটা পারো আগলে রেখে দাও নিজের কাছে। এই সময়টা আর ফিরে আসবে না।" সত্যিই সে সময় আর ফিরে আসেনি। আরো দুটো নাটক এলো তারপর। প্রথম শোয়ের মুখে অনিশ্চয়তা প্রতিবারই এসেছে, আছে। কিন্তু সে ছিল আমাদের সবার প্রথমবার। প্রথমবার একটা দল হয়ে মানুষের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো। প্রথমবার ভালোবাসার কথা বলা একজোট হয়ে।
  
হেরো রাজার কলন্দর আর শূন্যসংকেতও সেই ভালোবাসার কথাই বলে, বলতে চায়। এর বাইরে অন্তর-রঙ্গ'র আরো কোনোই প্রত্যাশা নেই কিছু থেকে। এই শহরে তৈরি হওয়া আরো অনেক দলের মতোই একটা দল অন্তর-রঙ্গ। ভবিষ্যতে তার জন্য কত বছরের ইতিহাস অপেক্ষা করে আছে, আমরা কেউই জানি না। আরও কী কী বলার আছে, এবং কিভাবে বলার, তাও জানি না। জানি বলতে শুধু এটুকু, আমাদের হাতে এক শহর পুঁজি আছে। সেই শহরকে নিয়ে নানা গল্পের জাল বোনা যায়। সেটুকু নিয়েই আমাদের কলকাতা ট্রিলজি। আমাদের নগরবাউল, কলন্দর, শূন্যসংকেত। শহরের সঙ্গে কথোপকথন চালাতে থাকি আমরা। চলতে চলতে কোথাও গিয়ে কলকাতা আর শুধু এক শহর থাকে না, কিছু মানুষের স্বর হয়ে ওঠে। মানুষ। চারদিকে শুধু মানুষই দেখা যায়। অসহায়, ক্লান্ত, নিরাশ। তারা শুধু ভালোবাসা চায়, ভালোবাসা জানতে চায়, উত্তরণ চায়। সে উত্তরণের পথ দেখাতে আমরা হয়তো অপারগ, কিন্তু যতদিন তাদের সঙ্গে একজোট হয়ে সে পথ খোঁজা যাবে, জানি, আশা আছে। সেই ভালোবাসার কথাই আপাতত বলুক অন্তর-রঙ্গ।
  
প্রতিমা বানানোর কাজ শেষে ভাদ্রের বিকেলে কুমারটুলির শিল্পীরা গঙ্গার পাড়ে গিয়ে বসেন। আলগোছে হাত রাখেন জলে; মাটি ধুয়ে জলেই মিশে যায়। চক্ররেল ছুটে যায় শহরে, মাথায়। ভাদ্রের বিকেলে সেই শহরের দিকে দু'হাত বাড়িয়ে বলি, না কিছু বলি না। ভেসে যায় সব। জল ভরে আসে চোখে। শহরের সব কথা আমরা জানবো না কোনোদিন, বলাও হবে না আর। শহরের অবশেষ কথাগুলো শহরেই ফিরে যায় আবার।

Comments