Followers

কলকাতাকথা - ৫

আমার মনে আরও একটা শহর আছে, এই শহরের চেয়ে সে বেশ অনেকটাই আলাদা। সেই শহরে সন্ধেবেলা ফেরার পথে দেখা হয়ে যায় কণাদের সঙ্গে। কণাদ চায়ের আড্ডা থেকে মুখ তুলে আমায় শুধোয়, “তাড়া আছে? একটু বসে যাও না হয়!” আমি কিছুটা আচ্ছন্নের মতো দেখি চারপাশ, বাজারের শত গোলমাল থেকে দূরে নিভৃতে ডাকে সেই স্বর। আহা, কতদিন বসা হয় না মুখোমুখি দুই বন্ধুতে, কতদিন কলকাতার অন্দরে পা রাখিনি দুজনে, কতদিন অলিন্দে বেজে ওঠেনি ডাহুকের ডাক।
   
কিন্তু এ তো আমার অতি-পরিচিত, প্রাত্যহিক কলকাতা নয়। সন্ধেয় ভুরুতে ঘন হয়ে আসা ঘামবিন্দু মুছে ফেলে আমি এগিয়ে যেতে চাই। কথা যোগায় না মুখে, উত্তর দেওয়া বিড়ম্বনা। আরও পথে পথে আমার জন্য অপেক্ষা করে অমিতেন্দু, শাশ্বত। অন্ধকার, কুপি জ্বালা সিগারেটের ঠেক থেকে তারা আগের মতোই জানতে চায়, আমার তাড়া আছে না কি! পথ দীর্ঘ হয়। অপেক্ষা না করার লোকও অনেক। না-ডাকার স্বরও অনেক। দক্ষিণে আর উপরে তাকিয়ে আমি নিজের অলিন্দেই কি নিজে খবর পাঠাই, যে তাড়া আর কারুরই নেই এখন? সময় অনেক। শুধু কথা যোগায় না বলার মতো। এক বিরূপ শূন্যতার মতো পড়ে থাকে বাগবাজারের মায়ের ঘাট। মৃতের উদ্দেশ্যে সরা, আধভেজা মাটির তাল, লাল সিঁড়ি বেয়ে জলের লকলকে উঠে আসা। কিন্তু সেখানে তো আর কেউ বসে না! সেখানে তো আমাদের প্রতীক্ষিত ডাহুক এসে ডুব দেয় না। কার সঙ্গে দেখা হলে ভালো লাগত, মনে আসে না আর বিশেষ। শূন্যতার মতো নদীঘাট আমাদের অপেক্ষায়, মানুষের অপেক্ষায় পড়ে থাকে, যে মানুষেরা তার গায়ে বসে, সামনের গহিন জলকে নদী নামে ডেকেছিল। কথা আর উচ্চারিত হয় না, কলকাতা অর্ধেক পেরোনোর আগেই তারা মরে যায়।
   
বসতবাড়ির ঝাঁক চিনিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে, পুরোনো ক্যাফে থাকে মোটা, সাদা কাপে কথা ভরে দেবে বলে। ছোট্ট খুপরি, দরজা নেই, তবু তো কেবিন। বসা যায় সেখানে। রাস্তার এপার ওপার জুড়ে কলকাতা অতীত আর স্বপ্ন নিয়ে খেলা করে। আমরা মাঝ থেকে পুরো বেবাক, নিশ্চুপ হয়ে যাই।
   
আমাদের এবং আমাদের মতো আরও অনেকের অন্তরে এমন আরেক কলকাতা আছে। সেখানে সবই আছে, শুধু কথা ছাড়া। সেখানে আমাদের কথারা হারায়। চিনি সবাইকে, জানি। কিন্তু কথা বলতে আর ইচ্ছে করে না। আমরা ক্রমশঃ চুপ হয়ে আসি, কথা বলা পিছিয়ে যায়। আমরা একে অন্যের বিরহে কাঁদি, শোকে আছড়ে পড়ি মনের উঠানে। প্লাবিত হয় কলকাতা। কথারা তবু অভিমানী। আহা, কেউ যদি বুঝতো, কথার অতীতেও ভালবাসা যায়। আমরা ভালবাসতে ভুলিনি আজও...

Comments