কলকাতাকথা - ৪
এখনকার লালবাজার স্ট্রীটের দক্ষিণ-পশ্চিমে যে সেন্ট অ্যান্ডরুজ গির্জা আছে, তার ঠিক উল্টোদিকে ১৭৫৬ সালের জুন মাস নাগাদ দাঁড়ালে দেখা যায় নবাব সিরাজের বাহিনী প্রায় এসে পড়েছে কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো নাট্যশালা ‘ওল্ড প্লে হাউস’-এর কাছে। এখুনি রঙ্গালয়ে ঢুকে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে সব, একেবারে মুড়িয়ে দেওয়া হবে সাহেবসুবোদের নাটক করার শখ। সত্যিই তাই। কোনও চিহ্নই আর পড়ে নেই সেই সময়ের। মার্টিন বার্ন কোম্পানির অফিস হয়েছে সেখানে। শুধু ১৭৫৩ সালে আঁকা উইল সাহেবের কলকাতা মানচিত্রে এই থিয়েটার ও লাগোয়া নাচঘর আজও দেখা যায়।
আরও ক’ বছর পরের কথা। সিরাজ আর নেই। সাহেবরা মোটামুটি সংসার পেতে ফেলেছে এ’ চত্বরে। তখন হেস্টিংসের আমল – আবার থিয়েটারের ভূত মাথা চাড়া দিতেই তৈরি হল ‘দ্য নিউ প্লে হাউস’। অন্য নাম ক্যালকাটা থিয়েটার। সেখানে চুটিয়ে নাটক করছেন সাহেবরা, দেখতে আসছেন মেম-সাহেবরা। কখনও ‘ভেনিস প্রিজার্ভড’, কখনও অ্যাভন-কবির লেখা ট্র্যাজেডি, কখনও আবার ‘স্কুল ফর স্ক্যাণ্ডাল’। শোনা যায়, সে যুগের অসম-সুন্দরী এমা রেংহাম কলকাতার সিনিয়র মার্চেন্ট ব্রিস্টো সাহেবকে বিয়ে করে তার চৌরঙ্গীর বাড়িতেই আরেকটা নাট্যশালা খোলেন, নামই ছিল, মিসেস ব্রিস্টো’স প্রাইভেট থিয়েটার। তিনিই অভিনেত্রী, আর প্রথম মহিলা-ডিরেক্টর। ছোট্ট, ছিমছাম (এবং অবশ্যই ঘরোয়া) এই আসরে ভিড় জমতে থাকে, কেন্দ্রবিন্দু এমা নিজে। ক্রমেই রাত বাড়ে, আর পরদিন ভরে লোকের মুখে অকথা-কুকথা ছড়িয়ে পড়তে থাকে সাহেব-মেম দের নিয়ে (সে যুগের পেজ থ্রি)। এরকম আরও, আরও অনেক কথা শোনা যায়। এথেনিয়াম থিয়েটার, হোয়েলার প্লেস থিয়েটার (হোয়েলার প্লেস রাস্তাটাই এখন হারিয়ে গেছে), চৌরঙ্গী থিয়েটার, বৈঠকখানা নাট্যশালা, আরও কত! আবার অন্যদিকে গেরাসিম লেবেদেফ তখন তার ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’ নিয়ে প্রায় একাই মাত করে দিচ্ছেন ছোট্ট শহর কলকাতাকে – কারণ, তার নাটকে ইংরাজির সঙ্গে বাংলা ভাষাও আছে, আর দর্শকের দলে ইংরেজের সঙ্গে বাঙালীও আছে।
কত-শত রাস্তা, কত রঙ্গালয়, তার কত হারিয়ে যাওয়া, জং ধরে যাওয়া ইতিহাস। কোনও কোনোদিন বিকেলে কণাদের সঙ্গে পথে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই এই রাস্তাগুলোয়ে, দেখি তখনকার ছোট্ট শহর কেমন দানব হয়েছে, কেমন নতুন নতুন সব বাড়ি উঠেছে এসব ঘরদুয়ার ভেঙে। কণাদের তবু আরও প্রাচীনে যাওয়ার শখ। বলি, আরেকটু এগোনো যাবে, অন্য কোনোদিন।
(স্মৃতিকল্পকথা, ২০১৭)
Comments
Post a Comment