অর্ধনদী
তার কাছে সব আছে। প্রথম এই কথা যবে মনে হয়েছিল, সে সময়ের অনেক স্মৃতিই এখন বেশ দূরের ঠেকে তাদের। তেমন একটা "এই তো সেদিন" অনুভূতি যে জারিত হয় তাদের স্মরণে, এমন নয়। বরং, জীবনটা কেমন রিয়ালিটি চেকের একটা সিরিজ হয়ে উঠেছে ক্রমেই। সময় তাদের যেমন ভিন্ন করেনি, তেমন একও করেনি। সব পাওয়ার যে যাপন শুরু হয়েছিল তাদের, তাতে এটুকু বেশ বুঝেছে তারা, 'সব' কারুর কাছেই থাকে না। সবের সামান্যই পাওয়া, সবের অনেকটাই বুঝে নেওয়া।
নদী দক্ষিণের দিকে টানে নিজেকে; টেনে নিয়ে যায়। বোঝার ফাঁকে কিছুদিনের বাধা পড়ে যায় মাঝেমাঝে। একে অন্যের থেকে কিছুটা ব্যবধানে থাকে তারা, অপেক্ষায়। রোজনামচা গড়িয়ে যায়, রোজনামচা ফুরোয়। কাজের দুনিয়ায় তারা সেঁধিয়ে যায় প্রতিদিন; অসহ্য, কুৎসিত নোংরামির নির্বাক, মুষ্টিমেয় দর্শক হিসেবে ডেস্কে বসে থাকে; বা বেরিয়ে যায় কাজের সূত্রে কোথাও, দূরে, শহরের বাইরে, ট্যুরে; বা দম ফেলতে কোনোদিন নতুন একটা রেস্তোরাঁ, বা ক্যাফে যাওয়া। তারপর ফিরে আসা এক ঘরে, নিজেদের কাছে, একে অন্যের কাছে। কিন্তু ফিরে এসেও তাদের মনে হয়, তারা আর তাদের নয় শুধু এইটুকু সময়েও। এই খাদ-মেশা সময় তাদের ভিন্ন করেনি, আবার একও করেনি।
অতএব, এই ছুট। দু' দিনের জন্য। বেড়াতে যাওয়া হয় না এমন নয়। বেশ হয়। ওই, ফেসবুকে ছবি যায়, with 7 others! কিন্তু একা-একা, দুজনে মিলে যাওয়া? স্মৃতি অপ্রস্তুত, ভ্যাবাচ্যাকা! সঙ্গ, সাহচর্য, উড়ো কথা, এক পল নির্জনতা, সবই আছে। অথচ, সময় কি কোথাও কম পড়িয়াছিল?
যে নদী দক্ষিণের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজেকে, তার খানিক জল, বাকিটা চরা। ঘন বালি সে তল্লাটে হাওয়ায় ছড়িয়ে যায় দিকে দিকে। মাঠে কাজ করা মানুষেরা চোখ ফিরিয়ে নেয় মুহূর্তে, আর নদী অলক্ষ্যে টেনে নেয় নিজেকে আর কিছুটা। কেউ জানে না, সেই আধ-চরার বালি একটু করে নদীর জলেও এসে ভাগ বসায়। অর্ধনদী বয়ে যায়।
গতকাল ওরা হেঁটে গিয়েছিল টাউনবাজারের দিকে। টাউনবাজার অবশ্য অনেকটাই দূরে। নানা মাপের পাথর, তামাটে মাটির পথ, আর ছোট ছোট ঘাসজমি, এই নিয়ে হাঁটার পথ। সে পথ কতদূর গিয়ে শেষে টাউনের পাকা সড়কে পরিণত হয়েছে, আর দেখা হয়নি ওদের। উদ্দেশ্যও ছিল না তেমন। যতক্ষণ না পা কামড়ে ধরবে, ব্যাথায় টনটন করবে কোমর, যতক্ষণ অব্দি এই হাঁটার কোনো অর্থ ছিল না, ততক্ষণ হেঁটেছিল ওরা।
- সকালের ওষুধটা খেয়েছিলে তো?
- ইয়েস! শার্প দশটায়।
প্রাত্যহিকতা থেকে বেরুনো যায় না মোটে। বসের মতো। সারাদিন চেয়ারে নেই, নেই, নেই; সব দেখেশুনে সাড়ে পাঁচটায় বেরুতে যাবে যেই, পাঁচটা আঠাশে তিনি এসে উপস্থিত। এই প্রান্তরে, নদী থেকে একটু দূরে, অথচ শহরেরও কাছে নয়, প্রাত্যহিকতা তাদের ছাড়ে না। দাঁত মাজা বা খাবার গরম করে নেওয়ার মতোই রোজকার, মধ্যবিত্ত খুচরো অসুখের প্রাত্যহিকতা। যা মনে রাখার মতো নয়, অথচ ভুলেও থাকা যায় না। বাড়িতে ফোন করে খবর নিতে হবে, ইলেকট্রিক বিল এসেছে কিনা এ' মাসের, মনে করিয়ে দিতে হবে, ড্রাইভারকে যেন আগামীকাল একবার রিমাইন্ডার দেওয়া হয় স্টেশনে পৌঁছে যেতে। নিজেদের জন্য চুরি করে জোটানো সময় শেষ করে ফিরে আসবে দুইজন কলকাতায়, আবার ঠিক ততটাও ফিরে আসবে না, যতটা যাওয়ার সময়ে ভেবেছিল।
অর্ধনদী দক্ষিণের দিকে টানে নিজেকে। আজ আর টাউনের পথে নয়, নদীর কাছেই এসেছে তারা। রিভারবেডেই, মাঝারি সাইজের একটা বোল্ডারে চড়ে বসেছে একজন, অন্যজন কিছুটা দূরে ক্যামেরায় বাঁধছে নদীকে। ওখান থেকে কি নদীকে বেশি সুন্দর লাগে? এখানে বসেও তো বেশ তার রূপালী জলের দক্ষিণভ্রমণ দেখা যায়। নদী -- সে যতদূরের হোক না কেন -- দেখলে তার বাড়ির কথা মনে পড়ে। বাড়ি, মানে দোতলা নয়। বাড়ি, মানে নীরবতা, মানে সমর্পণ, মানে হেরে না যাওয়া। মানে, ওই একটু দূরে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার ঠিক ততটা দূরে না থাকা আসলে। একান্তে একে অন্যের জন্য এসে যে দু'জন দু'জনের মতো আছে, এই ছেড়ে রাখার প্রশ্রয়ই ঘনিষ্ঠতম।
এই-ই বেশ। এটুকু পেলেই মনে হয়, তার কাছে সব আছে। সবসময় মনে হয় না। মনে হওয়ার কথাও নয়। তেমন দিন তো আমরা আর কাটাই না কেউই, কাটাতে পারি না, সবের আশ্বাস দেওয়া। আশেপাশের বয়স হয়ে আসা মুখগুলির দিকে তাকালে যে বলিরেখা দেখা যায়, আজ মনে হচ্ছে সেসব অর্ধনদীতে বালির কাটা-ফাটা দাগ। অর্ধনদী দক্ষিণের দিকে টানে নিজেকে। আজ টানছে। কাল যখন তারা আর এখানে থাকবে না, তখনও টানবে। সেই টানটুকু নিয়ে ফিরে যাওয়া। আবার কাজের ভারে নিচু হয়ে আসা, আবার নিত্যকার জ্বালা মেটাতে ছোটোখাটো আউটিং, বা খাওয়াদাওয়া। আবার হাসি হাসি মুখ নিয়ে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়ানো, আবার বিয়েবাড়িতে উদ্ভট প্রশ্নের মুখোমুখি, "এবার কিছু ভাবছিস?" কেউ কিছু ভাবছে না। ভাবার প্রশ্নও উঠছে না। আপাতত বেঁচে থাকা শুধু বুক ঠুকে। আপাতত, এই মুহূর্তটুকু। যে মুহূর্তে ভাবনা নেই। ভাবনায় চর পড়ে। নদী ধীর হয়। তাই, আপাতত শুধু বুঝে নেওয়া, সব থাকে না কারুর কাছেই। সব বুঝে নিতে হয়। সব কথা উচ্চারণে বাঁচে না। অনুচ্চারণ প্রয়োজন। সে ভাবে, তারা ভাবে, একসঙ্গে থাকার এই টানটুকু থাকুক। অর্ধনদী টেনে নিক দক্ষিণের দিকে।
(১৩. ১২. ১৮)
Comments
Post a Comment