কলকাতাকথা - ৬
গড়িয়াহাটের পুরোনো বইয়ের দোকানের পাশে যে ছোটো চা-ঝুপড়ি, সেখানের কাঠের বেঞ্চিতে বসে কণাদ। হেলান দেয় পাশের বাড়ির দেওয়ালে। চা ফুটছে, গোল্ড ফ্লেকে সুখটান পড়ে। ঘন হয়ে আসা ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে কণাদ বলে, “এই ক’ মাসে সময় কেমন পাল্টে গেল হঠাৎ করে!”
দিনের আলো নিভে আসে কলকাতায়।
সময় পাল্টানোর কথা আমার যে মনে পড়ে না, এমন নয়। পাল্টে গেছে অনেক কিছুই। রাস্তাঘাটে নতুন আলো বসেছে, ঢাকুরিয়া ব্রিজে আবার সারাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে, কলেজস্ট্রীটের সাহায় মুখ পাল্টে গেছে, প্যারামাউণ্টে শরবতের দাম চড়চড় করে বেড়েছে। কিন্তু এসবের চেয়েও বড়, আমাদের অভ্যেসগুলো পাল্টে গেছে এই কিছুদিনে। বন্ধুত্বের দাবি-দাওয়া অভ্যেস হতে নেই। পরিপার্শ্ব পাল্টালে সেই সখ্যে টান পড়ে, অভ্যেস – যেগুলো নিয়ে কখনও ভাবতে হয়নি আলাদা করে, এখন তাদের ধরে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়ে। কেউ হারিয়ে যায় না কোথাও, কিন্তু সময় বুঝিয়ে দিয়ে যায়, অভ্যেসের শেষে আমরা আসলে একাই। কণাদের কথায় শুধু প্রশ্ন করি, “পাল্টে গেল? যেমন?”
-এই যে, আমাদের সময় রইল না...
-কার থাকে, বল্?
-দেখা হওয়া ...
-নতুন সময়ে থিতু হয়ে যাই, আবার হবে ...
আমাদের উচ্চারণগুলো কোনোটাই শেষ অব্দি পৌঁছয় না। বলতে শুরু করে মাঝপথে আমরা বুঝি, এই কথাটা হয়তো না বললেও চলতো, কারণ প্রতিটা কথার সঙ্গেই সেই কথা রাখার দায় এসে পড়ে। তখন, যেন নীরবতাই আশ্বাস, এইভাবে আমরা কথাগুলোর সুতো ছেড়ে দিই। নির্ভার হই সমস্ত দায় থেকে। চায়ের কাপ হাতে এলে চুমুক কখনও কখনও অছিলাও বটে। ফুটপাথের অন্যান্য দোকানের কথার ভিড়ে আমাদের সমস্ত অনুযোগ হারিয়ে যায়।
শীতের কলকাতা ভারি অদ্ভুত। একদিকে সে পুজোর পরে আবার আলোয় মোড়া একটা শহর, অন্যদিকে শিরশিরে হাওয়া কাউকেই মেলায় না, শুধু হাতছানি দেয়; এত আলোতেও যেন একা ফেরার পথ। চা-সেবনের শেষে আমরা উঠে পড়ি, ভেতরের রাস্তা ধরে এগোতে থাকি রাসবিহারী আভেনিউয়ের দিকে। বহুতলের মাথায় মাথায় হিম জমে আছে। হলুদ আলোয় ভেসে যাচ্ছে রাস্তা, অথচ মানুষজন যৎসামান্য। বড়রাস্তায় এসে আমাদের পথ আলাদা।
-আসি...
-দেখা হবে...
উচ্চারণ ঝুলে থাকে দু’জনের মাঝে। কণাদ এগিয়ে যায় হাজরার দিকে, মেট্রোর পথে। হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায় ছোটোবেলার শিলিগুড়ি। একেবারে হঠাৎই। তখন প্রথম পৌষ। বিকেল পড়ে আসছে। দিদির হাত ধরে বেরিয়েছি, উল্টোদিকের কোয়ার্টারের কাগজ-ফুলের গাছ থেকে ফুল তুলবো দু’জনে। সেই অব্দি পৌঁছে দেখা গেল, সে গাছ নিচু হলেও আমরা ততধিক বেঁটে। হাত যাচ্ছে না ডালে-পাতায়। গাছের আঁকা-বাঁকা গুঁড়ি ধরে দিদি ঝাঁকাতে শুরু করলো। ছোটো ছোটো হাত, তার আর কত জোর! কয়েকটা শুকনো পাতা আর দু-চারটে ফুল খসে পড়লো বড়জোর। খুব দুঃখে ফিরে আসব, এমন সময় কোথাকার এক উত্তুরে হাওয়ায় ভেসে গেল কাগজ-ফুলের গাছ। গোলাপি আর সাদা ফুল ঝরে পড়ছে, আমি সাংঘাতিক ব্যস্ত হয়ে কুড়োচ্ছি, আর খালি দেখছি, দিদির পায়ের পাতায় পড়ে ফুলগুলো রঙিন হয়ে উঠছে আরও...
আজ, এই কলকাতায়, কণাদের চলে যাওয়া দেখে আমার এ’ দৃশ্য কেন মনে এল, জানি না।
Comments
Post a Comment