Followers

বিসর্জন

পুজোর বাইরে, সিঁদুর খেলা আর বরণের বাইরে, ভাসানের বাজনা আর বিসর্জনের বাইরেও এক দশমী আছে। সে শুক্লা কোনো তিথি নয়, শুধু কিছু 'আছে'র 'নেই' হয়ে যাওয়া বুঝতে শেখা, এক সুর।
  
'নেই' হয়ে গেছে অনেক কিছু। যেমন, আবছা মনে পড়ে, বছর পনেরো আগেও পুজোর বিকেলের আকাশ আরেকটু বেশি কমলা হতো। বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখে গড়িয়াহাট দিয়ে ফিরছি সায়নদীপ আর আমি। ষষ্ঠীর বিকেল। মেলোডিতে ঢুকে কিনলাম পাকিস্তানের 'স্ট্রিংস' ব্যান্ডের ক্যাসেট, 'দূর'। নীল রঙের কভার, ফয়জল আর বিলালের ছবি দেওয়া। B4U মিউজিক চ্যানেলে তার আগেই 'দূর'-এর ভিডিও গানটা শুনে দুজনেই উৎফুল্ল। ক্যাসেট কিনে ভাগাভাগি করে শোনা হবে কিছুদিন করে রেখে। মেলোডি থেকে বেরিয়ে দেখলাম, আকাশ কমলা হয়ে ভেঙে পড়ছে বড় রাস্তায়। সেই আকাশ এখন দশমী। কমলা রঙের ছায়া।
   
আরো ছোটবেলায়, বাড়ির আশেপাশে মাত্র দুটো পুজো হতো। তখন পুজোর বিকেলে মাইকে বাজতো সুমন, নয়তো চন্দ্রবিন্দু। খুব মনে আছে, বিকেল পেরিয়ে সন্ধে নামছে, আর শুনছি, "সন্ধে নেবে লুটে অনেকটা চেটেপুটে/ অন্ধকারের তবু আছে সীমানা"। আকাশ সেইরকম কমলা। দূরে, গড়িয়াহাটের মেঘমল্লারের গায়ে আলোর মালা, আর শুনছি, "হাওয়া দিল ছেঁড়া স্যান্ডাক, ভুল ঠিকানা"। স্যান্ডাক কী, তখনও জানি না। কিন্তু সুর আমায় বইয়ে নিয়ে যায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি, বন্ধুরা কী করছে এখন? বেরিয়েছে ঠাকুর দেখতে? বেড়াতে চলে গেছে? ওদের পাড়ায় মাইকে কোন গান চলছে? হাতের মুঠোয় ফোন নেই, যোগাযোগ করতে পারি না। অনিন্দ্য গেয়ে চলেন, "ব্যথার আদরে অবুঝ আঙুল রাখলাম"। রাতের শেষ গান ধরেন সুমন, "চেনা দুঃখ, চেনা সুখ, চেনা চেনা হাসিমুখ, চেনা আলো, চেনা অন্ধকার"। সুমন, চন্দ্রবিন্দুর সময় ফুরিয়েছে মাইকে। এখন আর কেউ তাঁদের গান চালান না পুজোয়। তাঁরাও দশমীর কোঠায় হারিয়ে গেছেন।
  
যেভাবে হারিয়ে গেছে আগেকার লাইটিং। টাকাপয়সা-ওয়ালা পুজোয় সার্কাসের জোকার, ফুল হাতে বাচ্চা মেয়ে, দোলনায় বাঁদর, বড় বড় আলপনা দিয়ে করা হতো লাইটিং। আর আমাদের ছোট ছোট পাড়ার পুজোয় বাড়ির ছাদ থেকে নিচ অব্দি ঝুলিয়ে দেওয়া নানা রঙের ডিমলাইটের সারি, আর রাস্তার দু'ধারে আর গাছের ডালে ডালে সবুজ সেলোফেনে ঢাকা টিউবলাইট। গুচ্ছের পোকা ভনভন করছে আশেপাশে।
  
দশমীর রঙ ধরে গেছে শালপাতার থালায় ভোগ আর মাটির গেলাসে। ভাত বা খিচুড়ি এসে পড়ার আগে জলে ধোয়া শালপাতার গন্ধ নেওয়া, জল খেতে গিয়ে মাটির ভাঁড়ের স্বাদ নেওয়া জিভে, কেটারারদের বদলে উদ্যোক্তাদের পরিবেশন, এসব আর নেই। সময় পাল্টেছে বেশ তাড়াতাড়ি। শেষ কিছু বছর পূজাবার্ষিকীতে আর সুনীলের কলম নেই। এক নবমীতেই চলে গিয়েছিলেন। হাতিবাগানে ঠাকুর দেখছি, এমন সময় উদ্যোক্তাদের একজন সাদা কার্ডবোর্ডে সুনীলের একটা ছবি আটকে টানিয়ে দিলেন প্যান্ডেলের সামনে। লেখা, "নবমীতে নেই নীললোহিত"। সুনীলের কলম, সুনীলের কথা এত জীবন্ত লাগতো, যে প্রথমে ভেবেই নিয়েছিলাম, হয় আজ সন্ধেতে এই পাড়ার পুজোর নাটকের নাম এটা, নয়তো ইয়ার্কি। কিন্তু কোনোটাই না। একদিন বাকি থাকতেই সুনীল গুটিগুটি আমার দশমীতে নিজের জায়গা করে নিলেন।
  
এভাবে দেখবেন, সারা বছর জুড়েই ছড়িয়ে আছে আমাদের কিছু কিছু দশমী, টুকরো-টাকরা আশ্বিন। যে আশ্বিনে শিউলির ঝরে পড়া ভারি সুন্দর লাগে আমাদের, আর ছাতিমের গন্ধে পুজোর পরের দিনগুলো মনে পড়ে। এই যে এক্ষুনি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি, সব আলো খুলে নেওয়া হয়েছে রাস্তায়, আর দূরের কোনো পাড়ায় এখনও আলো জ্বলছে, আর রাহুল দেবের গান বাজছে, এর মধ্যে শুধু এটুকু আশ্বাসই আছে, যে ওই আলোগুলোও আরো রাতে নিভিয়ে দেওয়া হবে।
 
অতএব, আর উৎসব নয়। অন্ধকার দিনে সূর্যের আলো পড়ে যায়। পুজোর শেষে আবার আমার আশ্বিন ফিরে আসে। রাস্তার হ্যালোজেন শেষ পাঁচদিন ভুলে নিপাট ভালোমানুষ সেজে অফিস ফেরতা আলো হয়ে জ্বলতে থাকে। দশমীর রাত ঘন হতে থাকে। ঋতুপর্ণ তাঁর রাধার জন্য লিখতে থাকেন, "সখী হম কবহু না অভিসারে যাউঁ; দুখ লাজ এতৎ সহ নাহি পাউঁ"…

Comments