কলকাতাকথা - ৩
কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন যাওয়ার পথে বালির পর বেলানগরে বন্ধুর বাড়ি। রেললাইনের ধারেই পুকুর। পুকুরের পর রাস্তা। রাস্তার পাশে বাড়ি। বন্ধু বলল, ট্রেনের জানলা দিয়েই স্পষ্ট ওদের বাড়ি দেখা যাবে, এমনকি টাটাও করা যাবে। ট্রেনে যেতে যেতে বন্ধুকে টাটা করা -- আহা, এ তো গপ্পো হলেও সত্যি। তাই, একবার বন্ধুকে টাটা করবো বলে শান্তিনিকেতন গেলাম। যাওয়ার পথে বাড়িটা ডানদিকে পড়ে। আমি পরম নিশ্চিন্ততায় ট্রেনের বাঁ দিকের জানলায় বসে রইলাম। বেলানগর স্টেশন হা-হা করে পেরিয়ে গেল। আমি কোন্ একটা বাড়ির কোন্ এক বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্দেশে আত্মহারা হয়ে হাত নাড়লাম। দূর থেকে তাকে বন্ধু বন্ধু লাগল না যদিও, তবু ট্রেনটা এমন গডস্পীডে চলছে, ভাবলাম আমার গতিবেগে বন্ধুর জিওগ্রাফিটা বদলে গেছে। এদিকে ক' সেকেন্ড পরেই বন্ধুর ফোন। সে তো উল্টোদিকে বাড়ির জানলা থেকে গোটা ট্রেনটাকেই প্রায় টাটা করেছে, অথচ তার এই চ্যারিটিতে কেউ প্রতি-টাটা করেনি বলে একদম হুব্বা হয়ে গেছে। ফোনে যেই না বলেছি "আমি তো বাঁ দিকে", সে কি খিস্তি! এখনও কানে বাজে। সেই থেকে আজ সাত বছর কেটে গেছে, সাত বছর কি, আমি সাত জন্মেও ভুলব না ওর বাড়িটা ডানদিকে। সেই 'তিব্বতে টিনটিন'-এর ক্যাপ্টেনের মতো দশা আমার। বলা হয়েছিল ছোর্তেনের ডানদিক দিয়ে যেতে, সেই থেকে "ওরেবাবারে, ডানদিক, ওরেবাবারে!" এখনও মনে মনে আওড়ে নিই ও' পথে যেতে গেলে।
আসল কথা হল, অনুষঙ্গ। কোনো কোনো জায়গার সঙ্গে কিছু মুহূর্তের, কিছু মানুষের অনুষঙ্গ লেগে থাকে। এই যেমন বোলপুরের পথের অনুষঙ্গ সেই রামছড়ানো মুহূর্তটা, এমন আরো কত আছে। এককালে লিলুয়াকে চিনতাম এমন একটা জায়গা হিসাবে, হাওড়া ফেরায পথে যে জায়গায় আমাদের ট্রেনটাকে দাঁড় করিয়ে অন্য ট্রেন, কারশেডের গাড়ি, ইঞ্জিন, পারলে ইঞ্জিন ছাড়া একটা বগিও এমনি হেঁটে হেঁটে চলে যায়। লিলুয়া হল সেই জায়গা যেখানে লাইন পেরোনোর সময় গরুছাগল ক্ষুর তুলে দেখালেও ট্রেন থেমে যাবে। লিলুয়া = সিগনাল। তারপর ইউনিভার্সিটিতে এক বন্ধু পেলাম, যার বাড়ি লিলুয়ায়। প্রথমে মজা করতাম, "বাড়িটা কোথায়? সিগনালে?" কিন্তু প্রাক্তন অনুষঙ্গ মুছে লিলুয়ায় আমার নব-অনুষঙ্গ হয়ে উঠল এই বন্ধু। এখন আর কোনোই যোগাযোগ নেই তার সঙ্গে, কিন্তু দূরপাল্লার ট্রেন লিলুয়া পেরোলেই আমার চোখে পড়বে টিকিটঘরের পাশের রিক্সাস্ট্যান্ড, যেখান থেকে আমরা তার বাড়ি যাওয়ার রিক্সা নিতাম।
স্কুল পেরিয়ে আমি ভর্তি হলাম মিশনের কলেজে। আর সায়নদীপ গেল আশুতোষ কলেজে। আশুতোষ কলেজ, মানে হাজরা। কাজেই, আমার কাছে হাজরা মানে সায়নদীপ। এভাবে বললে সায়নদীপ সবশেষে নির্লিপ্ত মুখে বলতো, "হ্যাঁ, আমার বাবা তো হাজরা জায়গাটা লটারিতে পেয়েছিল আর কি!" আশুতোষে সায়নদীপদের ডিপার্টমেন্টটা মেন বিল্ডিঙের থেকে একটু আলাদা, পাশের রাস্তায়। সে রাস্তাও সায়নদীপের। যদিও উইকডে'জে কোনোদিনই সে গলিতে বন্ধুসাক্ষাতে আমি ঢুকিনি। কারণ, সায়নদীপ অতি বন্ধুবৎসল এবং তার বন্ধুদের গ্রুপ আমার পদবীর চাইতেও বড়। এবং একসঙ্গে বেশি মানুষজন দেখলে বরাবরই আমার কেমন আলাপের ইচ্ছে সেঁধিয়ে যায়, আর মনে হতে থাকে, আমি বরং বাড়ি যাই। একক ভাবে সে দলের ক'জনের সঙ্গে আমার আলাপ-সখ্য প্রবল, কিন্তু আমি একেবারেই দলানুগত নই। ফলতঃ, হাজরায় সায়নদীপের সঙ্গে আমার পারতপক্ষে দেখা না হলেও, কখনও ইউনিভার্সিটি ফেরৎ যদি যতীন দাস পার্ক মেট্রোয় নেমে হেঁটে হেঁটে সাদার্ন অ্যাভেনিউতে সায়নদীপের বাড়ি যেতাম, মনে হত বন্ধুতার চত্বরেই ঘোরাফেরা করছি। সে' সময়ও কেটে গেছে, স্বাভাবিক নিয়মেই সায়নদীপ এখন অন্য জায়গায়। আমার কাছেও হাজরার অনুষঙ্গ পাল্টেছে। আশুতোষকেন্দ্রিক না হয়ে হাজরা এখন আমার কাছে রাস্তার এপার-ওপার দুদিকই। এবং তেইশ পল্লী দূর্গাবাড়ির রাস্তা, ছোটো চা-দোকান, হরিশ মুখার্জী স্ট্রীট, আরো কত কি যা লিখিত হওয়ার দাবী রাখে না, কিন্তু স্মার্ত হওয়ার অধিকার রাখে।
ঠিক এভাবেই, কোনো সন্ধের মুহূর্তে আমি যদি নদীর কাছে থাকি, আমার মনে পড়ে দশাশ্বমেধ। গঙ্গার কালো জল আলো করে সুখে দুঃখে ভাসছে বারাণসী। কোনো চায়ের দোকান বেশি রাত অব্দি খোলা দেখলে আমার মনে পড়বেই কল্হনের সেই খুপরি দোকান, হরিশচন্দ্রের গা ঘেঁষে, সমস্ত শ্মশানবন্ধুর জন্য, বিকেল চারটে থেকে ভোর চারটে অব্দি খোলা। মৃতদেহ দেখলে মনে পড়বেই মণিকর্ণিকা, সম্পূর্ণ কান্নাহীন এক বিদায়। রাত্রির মণিকর্ণিকায় তেরোটা চিতা ধকধক করে জ্বলছে, তার পাশে চরস-সেবন, হিন্দি গান -- এ আমার নিজের চোখে দেখা। এই দৃশ্যের যে বৈরাগ্য, তার মায়া ছেড়ে কোথায় যাব? কতদূর যাবো? পাশের ঘাটে গিয়ে চুপ করে বসে থাকি, যেখানে কোনো শব্দ এসে পৌঁছোয় না। শুধু গঙ্গা এসে লাগে পাথরের সিঁড়িতে।
এভাবে, আমার রোজই মনে হয়, আমাদের প্রিয় জায়গাগুলো খুব জীবন্ত। আমাদের মতো কথা তারা বলতে পারে না বটে, আমাদের না-আসা বা চলে-যাওয়া তারা আটকাতে পারে না ঠিকই, কিন্তু যতক্ষণ তারা আমাদের ধারণ করে, নিশ্চিত কোনো মায়া বা পিছুডাকের বুননে আমাদের বাঁধতে থাকে। যখন সংযোগ থাকে না, অনুষঙ্গ হয়ে তারা ফিরে আসে আমাদের কাছে, যাতে আমরা বেশি একা না হয়ে যাই।
Comments
Post a Comment