নবমী নিশি
২০০৪ সাল। পুরোনো স্কুল ছেড়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছি। ১০ বছরের অভ্যেস ছেড়ে ২ বছরের জন্য নতুন অভ্যেস তৈরি করার পথে নেমেছি। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে, স্কুলে ঢুকতে-বেরুতে, ক্লাসে অঙ্ক স্যরের ধমক খেয়ে ভয় চোখ আধ-বুজলেও শুধু পুরোনো স্কুলের প্রাণাধিক বন্ধুদের দেখছি। তাদের কণ্ঠই আমার ভরসা। বিকেলে নতুন স্কুল থেকে একা একা বাড়ি ফিরে ফোন করছি আনন্দকে, সায়নদীপকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হচ্ছে। খবর নিচ্ছি পুরোনো স্কুলের, আমার পুরোনো স্যরদের, পুরোনো ক্লাসরুমের, খেলার মাঠের। জানি, ওদের সঙ্গে দেখা হবে পুজোর ছুটিতে। একসঙ্গে, সবাই মিলে।
২০০৪ থেকে আমাদের বন্ধুদের একসঙ্গে পুজোতে বেরুনো, কিছুটা হলেও এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়াকে থামিয়ে দেওয়ার তাগিদে। ক্লাস ইলেভেনে অনেক দুঃসাহস থাকে, সময়কে পিছনে ফেলে দেওয়াও তখন খুব বড় ব্যাপার মনে হয় না। প্রথমবার বেরিয়েছিলাম আমরা চারজন – আমি, সায়নদীপ, আনন্দ আর পর্ণব। তারপরের বছরগুলোতে আসে বিপ্রদীপ, কৌশিক, দেবাংশু, প্রসেনজিত। এই ছিল মোটামুটি আমাদের দল। দুর্গাপুজো, সরস্বতী পুজো আর বেড়াতে যাওয়া। উনিশ-বিশ থাকতই, প্রতিবার সবাই যেতে পারত না, কেউ না কেউ কোথাও না কোথাও আটকে যেত। তবু, ছিলাম আমরা, ৫-৬ জন, একরোখা। সময়ের বিরুদ্ধাচারী।
পুজোতে আমাদের বেরুনোর দিন ছিল পঞ্চমী বা ষষ্ঠী, কখনও বা সপ্তমীও। অষ্টমী বা নবমীর জন্য আমরা বিশেষ একটা আশা রাখতাম না, কারণ আমাদের মূল লক্ষ্য বরাবরই থাকতো একটা ভালো কোথাও খাওয়া। আর অষ্টমী-নবমীতে খাওয়ার প্ল্যান ষষ্ঠীচরণও করবে না। সে সব দিন মন্দ ছিল না। পুজোর জন্য বাড়ি থেকে যা হাতখরচ পেতাম, মাইলের পর মাইল হেঁটে টাকা জমিয়ে ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়া – আহা, খাদ্যের চেয়ে খাটনির স্বাদ বরাবরই মধুর। প্রথমবার খেয়েছিলাম ‘স্পাইস’ বলে একটা রেস্তোরাঁয়। গোলপার্কের কাছে। চারজনের পেট-পুরে আহার হল মাত্র ৫০০ টাকায়, স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু সে রেস্তোরাঁ বেশিদিন রইল না, আমাদেরও পরের পুজো থেকে অন্য ঠেক দেখতে হল।
টানা ১২ বছর চলল আমাদের এই পরিক্রমা। শেষ দিকে একবার অষ্টমীতে ঘোরা হল। আর ২০১৬তে নবমী। ২০০৪-এর মতোই, চার বন্ধু। আনন্দ, সায়নদীপ, আমি, আর পর্ণবের জায়গায় দেবাংশু। দামী রেস্তোরাঁয় বসা রাত করে, খাদ্য-পানীয়তে হেসেখেলে খরচ। সবাইই চাকরি করি, উপার্জন করি। হাতখরচ বাঁচিয়ে খাওয়ার আদর আর নেই।
আমরা বন্ধুরা বেড়াতে যাওয়া শুরু করি ২০০৯ থেকে, প্রতি বছর নয় অবশ্য। তবে বেড়াতে যাওয়ায়-ও লোকের অভাব হত না। ২০১৬-র ডিসেম্বরে বারানসী গেলাম চার জন, খুব ঘুরলাম, গল্প হল, আড্ডা হল, কিন্তু নদীর জোয়ারের মতো সে-সবকে ছাপিয়ে যেতে লাগলো একটাই প্রশ্ন, আবার কবে? কারণ, প্রতিবারের মতো আমরা সেবার বুঝতে পারছিলাম না, আবার কবে আমাদের এক হওয়া হবে? বুঝতে পারছিলাম, আমরা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছি। আর কোনও প্রতিশ্রুতি ছিল না কোথাও। ফেরার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখেছিলাম, বারানসীর দীর্ঘ ঘাটগুলো কুয়াশাবুকে থম মেরে আছে।
দীর্ঘ ১২ বছর পর, ২০১৭-এ, ষষ্ঠী-সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী পেরিয়ে আর আমাদের বন্ধুদের এবার বেরুনো হল না। তার মানে এই নয় যে সব শেষ হয়ে গেল, বা আমরা আর বেরুবো না। তার মানে এটুকুই, যে শেষ অব্দি তো সেই হারলাম সময়ের কাছে। এতদিনের অভ্যেস, যার শুরুর কথা ছিল “যেন আমরা হারিয়ে না যাই”, সেই অভ্যেস, থামল তো একবারের জন্য! আমাদের দূরে যাওয়াই জিতল, স্বদেশে ও বিদেশে।
আগামীকাল বিজয়া দশমী। এখন এই লেখা লিখতে লিখতে শুনছি, পাড়ার মণ্ডপে ঢাক বেজে চলেছে একটানা। এবারে আমাদের পাড়া অন্যবারের চেয়ে জমজমাট। নবমীর বাদ্য বাজছে। আরও কিছুক্ষণ বাজবে। তারপর দশমীর মুখে সে থেমে যাবে। শিরশিরে রাত পেরিয়ে যাবে বৃষ্টি আর রোদের আশ্বাসে। ভোর আসবে। দশমীর ভোর। আবার বাদ্য বাজবে। কিন্তু এই এখন, এখন থেকে ঠিক একদিন পর পুরো এক বছরের মতো থেমে যাবে ঢাক। থেমে যাবে বাঙালীর সবচেয়ে আদরের উৎসব। প্রতিবার আমরা যারা কমার্শিয়াল পুজোকে গালি দিই, আমরাও এই এক চিলতে আলোয় ভেসে যাই। আমাদের সেই ভেসে যাওয়াও থেমে যাবে এক বছরের মতো।
পরের বছর আবার আসবে সব। কি আসবে? তখন সব কেমন থাকবে? আবার বন্ধুদের আশায় বসে থাকা? ২০০৪ –এর মতো সাহস এখন আর নেই। এক বছর অনেকটা সময়। বন্ধুরা শেষ বেরিয়েছিলাম নবমী নিশিতে। আজ তার পরের নবমী নিশি। আজকের কথা তো সেদিন ভেবে মেলাতে পারিনি। নবমী নিশি ভারি অদ্ভুত। সব আছে, কিন্তু নেই কোথাও কিছু। দূরে মাইকে বাজছে স্তোত্রপাঠ, “অহম রুদ্রেভিবসুভিশ্চরাম্যহম”। গান নয়, স্তোত্র। এই স্তোত্র ভোলার নয়। শেষরাত থেকে আবার ভোর হচ্ছে। এবারের পুজোর শেষ ভোর। স্বদেশ আর প্রবাস মিশে যাচ্ছে একে অন্যতে। সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী ...
©২০১৭
Comments
Post a Comment