কলকাতাকথা - ২
কলকাতা বিষয়ক চিঠি
================
[অন্তর-রঙ্গ'র 'নগরবাউল'-এর সবটুকু জুড়ে এক এবং একমাত্র একজনই --- কলকাতা। যে কলকাতা প্রতিদিন স্বচক্ষে দেখি আমরা, সে নয়। যে কলকাতা প্রতিদিন একটু করে পিছলে যাচ্ছে আমাদের হাত থেকে, বা লুকিয়ে পড়ছে এক জান্তব কলকাতার আগ্রাসনের মুখে, সে। অভয়ের কলকাতা, উভয়ের কলকাতা, নির্জনের কলকাতা, স্বজনের কলকাতা। পুরাতনী কলকাতা। যে কলকাতার ফুরিয়ে আসা নিয়ে বস্তুতঃ আমরা দুঃখ পাই, সে।
'নগরবাউল'-এর বাইরেও কলকাতাকে নিয়ে কম লিখিনি। কম প্রেম দেখাই নি সেই শহরের প্রতি, যাকে নিয়ে আমাদের প্রত্যেকের একার একার ঘর। প্রত্যেকের নিজের নিজের কলকাতা আছে। তাকে দেখার পথ আছে। আমারও তাই। দেখতে দেখতে কারুর কলকাতার সঙ্গে আমার কলকাতা মিলে গেলে ... আহা!
এখন বহুদিন পর আবার অন্তর-রঙ্গ'র আমরা বসেছি নগরবাউল ফিরিয়ে আনার ইচ্ছেয়। নতুন-পুরোনো মুখের সমাহার। কলকাতার গল্প, কলকাতার গান আবার দানা বাঁধছে রিহার্সাল রুমে। নগরের সিংহদুয়ারে আবার বাউল এসে দাঁড়িয়েছে। এমন সময় মনে হলো, কয়েক মাস আগে লেখা নিচের এই চিঠিতেই একমাত্র সেই কলকাতার কথা বলতে পেরেছি, যাকে বাঁধতে নগরবাউল লিখেছিলাম।]
*************************************************
কণাদ,
আর বোধ হয় দেরি না করাই ভালো। এ’ কথা এখনই মেনে নেওয়া যাক, যে আমাদের কলকাতা আর আমাদের নেই। অবশ্য শুধু কলকাতাকেই বা দোষ দেওয়া কেন! তুই, আমি, আমাদের মতো আরও কিছু মানুষ, যারা পায়ে পথ হাঁটতে এখনও গর্ববোধ করি কিছুটা অ-কারণেই, যারা মাটিকে ছুঁয়ে মানুষের মন বুঝতে পারার অহংকার দেখাই, তাদের কাছে এই পৃথিবীর বাসযোগ্যতাই যথেষ্ট প্রশ্নের সম্মুখীন এখন। কলকাতার কথা আলাদা করে এ’ কারণেই বলা, ঠিক যে কারণে নিকটজনের উপর অভিমান বেশি হয়।
কলকাতা নিয়ে বলার কথা তোকে ছাড়া আর কার সঙ্গে, বল! ছোটো থেকে চিনে নেওয়া কলকাতার যতটুকু নিংড়ে তোকে দেওয়া সম্ভব, দিয়েছি, তোর সঙ্গে এই শহর এবং অন্য শহরেরও পথে চলতে চলতে। সবটা কোনোদিনই দিয়ে ওঠা যায় না, কারণ এতদিনে নিশ্চয়ই তুইও বুঝেছিস, আমাদের শহরে বেঁচে থাকার বহু সুতো সময়ের সঙ্গে বাঁধা থাকে। একবার সে’ সময় পেরিয়ে গেলে আমি তোর সামনে তাকে বড়জোর স্মরণ করতে পারি মাত্র, তোকে সে’ সময়ে নিয়ে যেতে আমি পারিনি। যেমন ধর, ছোটবেলায় শনিবার মর্নিং স্কুলের শেষ ঘণ্টাটা যখন বাজত, ঘড়ির কাঁটায় ন’টা। এক ধরণের রোদ পড়ে থাকতো তখন বারান্দা জুড়ে। খসখস জুতোর শব্দ করে স্কুলটা ফাঁকা হয়ে যেত। আর বেরিয়ে এসে বাগানের রঙ্গন ফুলের উপর সেই একই রোদ পড়ে থাকতে দেখে মনে হত, আমার সঙ্গে গোটা শহরেরই ছুটি ঘোষণা করা হয়ে গেছে। যেমন, প্রথমবার খুব ভোরবেলা পুজো দেখে উত্তর কলকাতা দিয়ে গাড়ি করে ফেরার সময় আমরা কিছু ভেতরের রাস্তা ধরেছিলাম। সেখানে বাড়ির দরজাগুলো দেখে খালি মনে হয়েছিল, দরজা খুলে ঢুকলেই বুঝি লাল মেঝের একটা ঘর, সেখানে বসে ঠাণ্ডা হয়ে নিলে কেউ কিচ্ছু বলবে না, কারণ আমি আর তারা এক শহরের লোক। একরকম দুঃখ, ইচ্ছে, ক্লান্তি আমাদের। আরও কত কী! এর কথা আমি তোকে বলেছি হয়তো শুধু। তোরও নিশ্চয়ই এমন কিছু স্মৃতি আছে, যা সময় নিয়ে গেছে। তবু, তার বাইরেও তো আমরা চিনেছি কলকাতাকে – তার পথঘাট, বাজার, দোকান, বহুতল, শপিং মল, বিপজ্জনক বাড়ি, ধাপার মাঠ, মদের ঠেক, কোন হাওয়ায় গাঁজা টানলে নেশা বেশি হয়, কবীর সুমন, আন্ডারগ্রাউণ্ড মিউজিক, রবীন্দ্রনাথ, বিকেলের ময়দান, সন্ধের টলমল পায়ে ফার্ন রোড, স্ট্রীট ফুড, পুরোনো কেবিন, আরও অনেক, অনেক। সবচেয়ে বড় কথা কণাদ, আমরা শেষ এত বছরের সাধনায় একটা শহরকে বাঁচতে শিখেছিলাম। তুই তোর মতো করে, আমি আমার মতো করে। আর দুজনে, যৌথভাবে। বাসে, ট্রামে, ট্রেনে, ট্যাক্সিতে, পা-গাড়িতে, ভিন-শহরে রাস্তা খুঁজতে খুঁজতে আমরা আমাদের কলকাতাকে খুঁজে পেয়েছি। একেবারে চেটেপুটে বেঁচেছি। তাই, আজ মনে হয়, এই চিঠি তোর কাছে পৌঁছনোর আগেই আমাদের এই জীবনের মতো কলকাতা বাঁচা শেষ হয়ে যাবে।
আমার এক অগ্রজপ্রতিম বন্ধু মাঝে মাঝেই তোর কথা জানতে চান। তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই নি কখনও। আমার লেখা মারফতই তিনি তোকে চিনেছেন। শেষ বছরখানেক যাবৎ আমাকে মাঝে মাঝেই তাঁর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, “কণাদ কই? আর তোদের কথা লিখবি না?” আমি সময় চেয়েছি তাঁর কাছে, বহুবার। বহুবার তোর-আমার সত্যিকারের আর মিথ্যেকারের দেখা হওয়া গুলো নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি আবার। হয়নি, কণাদ! বিশ্বাস কর, তোকেও বলিনি, তাকেও বলিনি, যে হয়নি। পারিনি। কারণ, আমাদের কথা যে বলবো, তার জমিটাই তো আর নেই কণাদ, যে জমি শহর কলকাতা দিত দু’হাত ভরে। আমাদের হয়ে ওঠার পিছনে তো এই শহরটাই – এই সত্যি যখন এতদিন লিখে এসেছি, আজ কোন মুখে তাকে বলবো, বল, যে for the last one year, this city has only been the cause of our unbeing! এত সহজে ছেড়ে দেব?
আজ সত্যিই মনে হচ্ছে, ছাড়ার সময় এসেছে। চারদিকে তাকিয়ে দ্যাখ, যুদ্ধ ছাড়া, খুন ছাড়া, হিংসা ছাড়া, ধর্ষণ ছাড়া আমি তো আর কিছুই দেখি না আজকাল! তুই দেখিস? আগে টিভির পর্দায়, কাগজের পাতায়, মুখে মুখে এসব খবর শুনলে বেরিয়ে পড়া যেত একা একা। দু’ ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা পথে হেঁটে, চায়ের দোকানে খানিক থেকে, বা গঙ্গার নির্জন ঘাটে একা বসে সব ভয় কেটে যেত। শহরটা যেন আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিত, মনে হত, ঈশ্বর বুঝি এভাবেই শান্তি দেন। এখন কেমন যেন ভয় শুধু চারদিকে, প্রতিটা রাস্তায়, মোড়ে মোড়ে, বাড়ির চৌকাঠে, মুখের বলিরেখায়, শুধু ভয় দেখি আমি কণাদ। বেঁচে থাকা দেখি না। মুখ খুললেই শুধু গালাগাল, প্রতিশোধস্পৃহা, মৃত্যুকামনা দেখি আমি। বেঁচে থাকা দেখি না। তবু, এ’সব থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে করতেও মানুষেরা কেমন লঘু হয়ে গেছে, আরও মরে গেছে। এখন, আলোচনাও করা হয় মুহূর্তকেন্দ্রিক, সামান্য, অগভীর। কারণ গভীর কথা ধারণ বা বহন করার শক্তি, সামর্থ্য, ইচ্ছে, সবই বোধ হয় আমরা হারিয়েছি।
এত ভয়, এত অন্ধকার নিয়ে আগে বাঁচিনি, কণাদ। নিরপরাধ রাস্তা দিয়ে হাঁটলেও মনে হয়, ওই কোণে হয়তো গতকাল রাতেই কুপিয়ে খুন করা হয়েছে, বা একটা মেয়ের জামা টেনে ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে। কাঁচ তোলা এসি বাস দেখলেই মনে হয়, যৌনাঙ্গে রড ঢোকানোর নরক এটা! আমার অতিপরিচিত ঢাকুরিয়াতেও রাত দশটার অটোয় সহযাত্রীরা মেয়েটার জামা ব্লেড দিয়ে কেটে দেয় আনন্দ পেতে! শিক্ষাকেন্দ্রে চার বছরের বাচ্চাকে মলেস্ট করা হয়, কোথাও আট বছরের মেয়েকে রেপ করে খুন করে দেওয়া হয়, কোথাও সেটা কমে দু’ মাসও হয়। খালি যুদ্ধ হয় চারদিকে, আর এত মানুষ মরে যায়। বা আদর্শ ভিন্ন হলে, তুলে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হয়। আর আমরা প্রতিদিন, প্রতিটা দিন কর্মক্ষেত্রে শার্ট গুঁজে পরে আদর্শ নাগরিক হওয়ার বাণী আওড়াই, বলি শিক্ষার কত গুরুত্ব, আর তারপর ...! বাদ দে।
চিঠির উত্তরের প্রয়োজন নেই। কারণ, আমি জানবো তুই পড়েছিস। আর পড়ার শেষে আমার বা তোর কিছুই আর বলার নেই। আজকাল কথা খুব কমে আসছে না? শুধু নিয়মমাফিক কিছু বুলি, সেগুলো না বললেও বা উত্তর না পেলেও কিছু যায় আসে না তেমন! বাদবাকিটা শূন্যতা, চুপ করে থাকা। বোবা হয়ে গেলে ভালো হত। আমার কলকাতা আর আমার নেই।
আমাদের পথেঘাটে হাঁটাচলা, বৈঠকি আড্ডা বন্ধ হয়ে এসেছে। যে দিকে সবকিছু এগোচ্ছে, আর কিছুদিন পর আমরা অসূর্যম্পশ্যা হয়ে গেলেও অবাক হব না। শহর ছাড়তে ইচ্ছে করি, ছাড়তে পারিও যে কোনও দিন, ছাড়ি না, কারণ আমরা কয়েকজন এখনও হাস্যকরভাবে আশাবাদী। বা বোকার মতো লয়াল। বা, কোথাও যাওয়ার সুযোগ জোটে না, তাই! এতদিন যাবতীয় পাওয়া-না-পাওয়া তোর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অধিকার থেকেই এই শেষ কথাগুলো বলছি – যে যাই বলুক, আমরা যে-ভাবে ভাবতে শিখেছিলাম, জানতে শিখেছিলাম, শহরটাকে বাঁচতে শিখেছিলাম, ভুলে যাস না। এখন সব কিছু খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে, কতদিন ধরে রাখতে পারবি বা পারবো জানিনা। কিন্তু এখনই ছেড়ে দিস না। এখনও, আর একজন কেউও যদি বিশ্বাস না করে, তুই বিশ্বাস রাখিস, আর জানিস, আমিও রাখবো, যুদ্ধ বা দেশ-দখলের চেয়ে আজও প্রাণ আগে, দলীয় মতবাদের চেয়েও আগে সম্পর্ক। সবার আগে বেঁচে থাকা, সবার আগে বিশ্বাস, সবার আগে মানুষ। এর অন্যথা যেন আমরা না করি। কলকাতা, আমাদের শহর, আমাদের ধাত্রী, যদি এতে এক মুহূর্তও বেশি বাঁচে, সেটুকুও অনেক।
শুভংকর।
Comments
Post a Comment