Followers

বিবাহ মরসুম

বিবাহের মরসুম আসিল বলে।
প্রেম দিবসে বাতাসে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা   কিঞ্চিৎ অধিক থাকায় অনেকেই টিটকিরিপূর্ব্বক লিখিয়াছিলেন, "ফিলিং হট"। সপ্তাহান্তে বিবাহের দিনগুলিতে সুখী দম্পতির দেঁতো হাসি ও মধুচন্দ্রিমার গুজবে কান পাতিয়া তাহারা এইবার "ফিলিং বার্নট্" লিখিবেন কিনা, ইহাই দ্রষ্টব্য।
 
তৎসত্ত্বেও, যে যাহাই বলুক, বিবাহ কিন্তু নবদম্পতির জন্য নহে। তাহারা তো পিঁড়িতে বসিয়া ঘর্ম ও মন্ত্রলিপ্ত হইয়া একে অন্যের ছাইপাঁ-- ক্ষমা, প্রেমপাশে আবদ্ধ হইবেন। বড়জোর ইহার চাহিতে অধিকতর কোনো বন্ধনে লিপ্ত হইবার পথে তারা প্রলুব্ধ হইতে পারেন, প্ররোচিত হইতে পারেন, বান্ধবজনের মিলিত গুঞ্জনের সন্মুখে তাহারা লাজে রক্তিমাভ হইতে পারেন। আর কিছু নয়।
 
বরং বিবাহ তাহাদের জন্য, যাহারা এইবার বিবাহ করিলেন না। যেমন আমরা। বিবাহ করি নাই, করিব এমন পণও কোথাও রাখি নাই। তৈল ঢালা স্নিগ্ধ তনু, তাই হরধনু ভঙ্গেও অক্ষম। যে কোনো বিবাহকে আমরা এইভাবে দেখিয়া থাকি: পাত্রী ও পাত্রপক্ষ আয়োজিত খাদ্যোৎসব। পরিচিত হউন, ও বিনামূল্যে (?) নৈশভোজের আমন্ত্রণ পান। সেহেতু ইদানীং পরিচিতি বাড়াইবার হিড়িক পড়িয়াছে। রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে এমন শিষ্টাচারী হইয়াছি যে নিজচক্ষুই সিক্ত হইয়া উঠে। বসন্তে আমরা ট্রামে বাসে আসন ছাড়িয়া দিই; গরমে চল্লিশোর্ধ যে কাহাকেও কন্যাদায়গ্রস্ত মনে হয়। বিবাহরাজ্যে পৃথিবী খাদ্যময়; পাতের অন্তিমে চাহি প্রিয় টুটি-ফ্রুটি।
  
তবে সুধী, বিপদ বহুমাত্রিক। পূর্বে তো গিলিতেন বসিয়া, কব্জি ডুবাইয়া। পরিবেশনে আসিয়া পাতে কবিরাজি ছুঁড়িত, যেন বাতিল হার্ড ডিস্ক। আপনি আর খাইবেন না, মারিয়া ফেলিলেও আপনার গলা দিয়া পাঁঠা আর নামিবে না, ঠিক সেই সময় আপনার সন্মুখে আসিয়া দাঁড়াইবেন আয়োজক ফুলবাবু, সাক্ষাৎ যমদূত। তিনি হাসিবেন, দুলিয়া দুলিয়া কহিবেন বটে, "আরেকটু মাংস বলি?",  কিন্তু আপনি বেশ বুঝিবেন, তার অন্তর্নিহিত বয়ানটি হইল, "খাবি না মানে? তোর বাপ খাবে।" এখন হইয়াছে আরেক সমস্যা। শুরুতেই পরিবেশন করা হইবে ময়দামিশ্রিত ঝাল শিশুভুট্টা। বন্ধুগণ, সাবধান! ইহা আয়োজকদের  চাল! ভুলবশতঃ এই ফাঁদে পা দিয়াছেন, কি আপনার উদর ফাঁপিয়া ঢোল। ভেটকি অবধি পৌঁছাতে দুইবার ভাবিবেন। অতএব, পাত্র লহিয়া চলিয়া যান ঐ দূরে, যেই স্থানে অতিআত্মমর্যাদাসম্পন্ন পরিবেশক ঊষ্ণ ডাল লইয়া বসিয়া আছেন। ইহার সন্মুখে আপনি যদি শুধুই দাঁড়ান, আধ হাতা ডাল পাইবেন। তাতে মটরশুঁটি, গাজর থাকিবে না। অল্প হাসিলে এক হাতা, সব্জি সমেত। গদগদ হইয়া ধন্যবাদ জ্ঞাপনে দেড় হাতা। তারপর আপনি খিলখিলিয়ে, হো হো করিয়া যতই হাসুন, প্রয়োজনে  পরিবেশকের নামে সরণী খুলিয়া ফেলুন, ডাল আর উঠিবে না। মাছ বা মাংস চাহিলেও ইহারা এমন ঝোল দিবে আপনাকে যে আপনিও অনুতপ্ত হইবেন, কেন শৈশবে অ্যান্ডারসনে  সাঁতার শেখেন নাই।
  
খাদ্য যাহাদের একমাত্র পন্থা, তাহাদের জন্য আজকের এই কথাগুলি। আমাদের ধমনীতে এককালে যে রমণীরা বহিতেন, তাহারা আজ বিবাহযোগ্যা, কেবলমাত্র খাদ্য দিয়াই তাহাদের দুর্লঙ্ঘ বন্ধন অতিক্রম করা সম্ভব।
  
(পুনঃ সায়নদীপ কহিল, তুই লিখিস মন্দ না, কিন্তু সে লেখা বড় দুঃখের। সবাই কি তোর মতো দুঃখকে জানতে চায়? না। তাহলে যারা চায় না, তাদের জন্য লেখ কিছু। এককালে তো লিখতিস মজার লেখা।
   
সে সব লেখা দেওয়া যায় না। তবু, সায়নদীপ আমার সুহৃদ, আর ভাবিলাম, ঠিকই তো। দুঃখ নিয়ে লিখি বটে, কিন্তু সবাই কি তাহা পড়িতে চায় সর্বক্ষণ?
তাই এই লেখায় কিছুটা সচেষ্ট হওয়া। দেখা যাক, কতদিন লিখিতে পারি।)

Comments