Followers

ছেলেবেলা - ১

শিলিগুড়িতে আমাদের কোয়ার্টারের একপাশ দিয়ে ক্যাম্পাসের উঁচু পাঁচিল চলে গিয়েছিল। আর বাকি তিনদিক জুড়ে ছিল বিরাট খেলার মাঠ। তার মাঝখান দিয়ে সরু পিচের রাস্তা। অনেকটা মাঠের পর একটা করে কোয়ার্টার। তারপর আবার মাঠ। সে মাঠে সবাই খেলত। গরু-ছাগলও যেমন খেলত, আমরাও খেলতাম। আমি অবশ্য তখন মাঠে গিয়ে চুটিয়ে খেলার পক্ষে বেশ ছোট। তাই, বিকেল হলেই আমাদের বাড়িটার মাঠের দিকের জানলার গ্রীল ধরে ঝুলে ঝুলে দাদাদের ক্রিকেট খেলতে দেখতাম। একবার একজনের মারা শটে ক্যাম্বিস বলটা প্রচন্ড জোরে এসে গ্রীল ধরে থাকা আমার আঙুলটা প্রায় থেঁতলে দিয়েছিল। খেলা দেখতে গিয়ে রিটায়ার্ড হার্ট হওয়ার উদাহরণ বেশ কম। আমি সেই বিরল প্রজাতির একজন।
     
সেবার বাবা দিন দুয়েকের জন্য কলকাতা গেল, দাদুকে নিয়ে আসবে বলে। মা'র জিম্মায় রইলাম আমি আর দিদি। পরে মা'র কাছে শুনেছি, ওই দু' দিন আমাদের সামলানোর স্মৃতি মায়ের কাছে বিভীষিকার মতো ছিল।দিদি তখন অতটা ছোট না, আবার এতটা বড়ও না যে সব কাজ বুঝেশুনে করবে। একটু শান্তিপ্রিয় ছিল স্বভাবে ও, যদিও বড্ড বকবক করতো। আর আমার কথা বাদই দিলাম। নিতান্তই ছোট, সবকিছু ছড়াই। কখনও দৌড়তে গিয়ে টেবিলের কোণে ধাক্কা খেয়ে কাঁদছি, কখনও জলের গ্লাস উল্টে দিচ্ছি, তারপর ভুলে নিজেই সে জলে আছাড় খাচ্ছি, কখনও মা রান্না করছে আর আমি পাশে দাঁড়িয়ে - রাবণ যে তওরাল ('তলোয়ার' কে আমি যা বলতাম) দিয়ে জটায়ু পাখির ডানা কেটেছিল, সেটা শ্রীলঙ্কার মিউজিয়ামে আছে কিনা - এসব খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করে চলেছি। কেবল একটা জিনিসই তখন ভালো করে করতে শিখেছিলাম, সেটা হল দিদির সঙ্গে ঝগড়া। বিশেষ কোনো কারণ লাগত না আমাদের। ঝগড়ায় আক্রমণটা আমিই বেশি করতাম। বেশি রেগে গেলে দিদির হাতে, গায়ে খুব জোরে চিমটি কেটে পালিয়ে যেতাম, সুযোগ পেলে দিদিও কয়েক ঘা বসিয়ে দিত। তারপর দুজনেই বকুনি খেয়ে কিছুক্ষণ কাঁদতাম। আমি এত জোরে কাঁদতাম যে পরের দু'দিন গলাব্যথা থাকত। দিদি আবার চিৎকার করত না। খাটের এক কোণে বসে তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না, কেন তাকে ভাইয়ের চিমটি আর মায়ের বকা, দুই-ই খেতে হয়! তারপর চোখ-নাক-মুখ লাল করে দিদি বারান্দায় গিয়ে চুপ করে অনেকক্ষণ বসে থাকত মাঠের দিকে তাকিয়ে। আমাদের কোয়ার্টারের সামনের মাঠের ধার দিয়ে দুটো বাবলা গাছ ছিল, তার পাশ দিয়ে একটা সরু নুড়িপাথরের রাস্তা পিচের রাস্তার থেকে আলাদা হয়ে চলে গে'ছিল ওই মহানন্দার দিকে। ওদিকে কারুর বাড়ি ছিল না। অনেক ঝিরঝিরে গাছ-গাছালি পেরিয়ে মহানন্দার তীরের সঙ্গে রাস্তাটা মিশে যেত। দিদি ঐদিকে তাকিয়ে বসে থাকত ঝগড়া হলে। পরে, রাগ কমে গেলে আমি গিয়ে পিছন থেকে গলা জড়িয়ে দাঁড়ালে ও ঘাড় শক্ত করে রাখত, এদিকে তাকাতো না। তারপর ওর চেপে রাখা হাতের মুঠো থেকে বুড়ো আঙুলটা টেনে বার করে নিজের হাতের বুড়ো আঙুলটা ঠেকিয়ে আস্তে আস্তে বলতে হত, "ভাব... ভাব... ভাব"। তিনসত্যির মতো তিনবার ভাব। দিদির নিয়ম। না হলে রাগ কমবে না। না হলে রাতে আমার 'চাঁদের পাহাড়'এর গল্পও শোনা হবে না।

Comments