Followers

অ্যাকাডেমিক হযবরল

বেজায় গরম। গাছতলায় দিব্যি ছায়ার মধ্যে চুপচাপ শুয়ে আছি, তবু ঘেমে অস্থির। ঘাসের উপর হাতপাখাটা ছিল, হাওয়া খাওয়ার জন্য যেই সেটা তুলতে গিয়েছি অমনি হাতপাখাটা বলল “অউফ্‌ক্লারুং!” কি আপদ! হাতপাখা অউফ্‌ক্লারুং বলে কেন?
চেয়ে দেখি হাতপাখা তো আর হাতপাখা নেই, দিব্যি দড়ি পাকানো কালো-ফ্রেম চশমার একটা স্কলার নাকের পাটা ফুলিয়ে প্যাট্ প্যাট্ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!
আমি বললাম, “কি মুশকিল! ছিল হাতপাখা, হয়ে গেল একটা স্কলার।”
অমনি স্কলারটা বলে উঠল, “মুশকিল আবার কি? ছিল একটা অ্যান্টিলোপ, হয়ে গেল দিব্যি একটা আন্তিগোনে। এ তো হামেশাই হচ্ছে।”
আমি খানিক ভেবে বললাম, “তা হলে তোমায় এখন কি বলে ডাকব? তুমি তো সত্যিকারের স্কলার নও, আসলে তুমি হচ্ছ হাতপাখা।”
স্কলার বলল, “স্কলারও বলতে পার, হাতপাখাও বলতে পার, রিহ্যাবও বলতে পার।” আমি বললাম, “রিহ্যাব কেন?”
শুনে স্কলারটা “তাও জানো না?” বলে এক চোখ বুজে ফ্যাচ্ফ্যাচ্ করে বিশ্রীরকম হাসতে লাগল। আমি ভারি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। মনে হল, ঐ রিহ্যাবের কথাটা নিশ্চয় আমার বোঝা উচিত ছিল। তাই থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, “ও হ্যাঁ-হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।”
স্কলারটা খুশি হয়ে বলল, “হ্যাঁ, এ তো বোঝাই যাচ্ছে— রিহ্যাবের রি, স্কলারের সার, হাতপাখার চ— হল রিসার্চ। কেমন, হল তো?”
আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না, কিন্তু পাছে স্কলারটা আবার সেইরকম বিশ্রী করে হেসে ওঠে, তাই সঙ্গে সঙ্গে হুঁ-হুঁ করে গেলাম। তার পর স্কলারটা খানিকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল, “সার্টিফিকেট লাগে তো সেমিনারে গেলেই পার।”
আমি বললাম, “বলা ভারি সহজ, কিন্তু বললেই তো আর যাওয়া যায় না?”
স্কলার বলল, “কেন, সে আর মুশকিল কি?”
আমি বললাম, “কি করে যেতে হয় তুমি জানো?”
স্কলার একগাল হেসে বলল, “তা আর জানি নে? সিএফপি, অ্যাবসট্র্যাক্ট, লাঞ্চবক্স, সেলিকল, সার্টিফিকেট, ব্যাস্! সিধে রাস্তা, কয়েকদিনের মামলা, গেলেই হল।”
আমি বললাম, “’তা হলে রাস্তাটা আমায় বাতলে দিতে পার?”
শুনে স্কলারটা হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। তার পর মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু, সে আমার কর্ম নয়। আমার ডেঁপোদাদা যদি থাকত, তা হলে সে ঠিক-ঠিক বলতে পারত।”
আমি বললাম, “ডেঁপোদাদা কে? তিনি থাকেন কোথায়?”
স্কলার বলল, “ডেঁপোদাদা আবার কোথায় থাকবে? ডিপার্টমেন্টে থাকে।”
আমি বললাম, “ডিপার্টমেন্টে গেলে তাঁর দেখা পাবো তাহলে?”
স্কলার খুব জোরে মাথা নেড়ে বলল, “সেটি হচ্ছে না, সে হবার জো নেই।”
আমি বললাম, “কিরকম?”
স্কলার বলল, “সে কিরকম জানো? মনে কর, তুমি যখন যাবে যাদবগড়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, তখন তিনি থাকবেন জেননিউপুরে। যদি জেননিউপুরে যাও, তা হলে শুনবে তিনি আছেন প্রেসিশায়ারে। আবার সেখানে গেলে দেখবে তিনি গেছেন কলুটোলায়। তারপর হঠাৎ একদিন শুনবে ইনকা মারতে চলে গেছেন। কিছুতেই দেখা হবার জো নেই।”
আমি বললাম, “তা হলে তোমরা কি করে দেখা কর?”
স্কলার বলল, “সে অনেক হাঙ্গাম। আগে হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় নেই; তার পর হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় থাকতে পারে; তার পর দেখতে হবে, দাদা এখন কোথায় ডেঁপোমি করছে। তার পর দেখতে হবে, সেই হিসেব মতো যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে, তখন দাদার ডেঁপোমি কোন পর্যায়ে থাকবে। তার পর দেখতে হবে—”
আমি তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললাম, “সে কিরকম হিসেব?”
স্কলার বলল, “সে ভারি শক্ত। দেখবে কিরকম?” এই বলে সে একটা থিসিস ঘাসের উপর রেখে বলল, “এই মনে কর ডেঁপোদাদা।” বলেই খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে চুপ করে বসে রইল।
তার পর আবার ঠিক তেমনি আরেকটা থিসিস রেখে বলল, “এই মনে কর তুমি,” বলে আবার ঘাড় বাঁকিয়ে চুপ করে রইল।
তার পর হঠাৎ আবার একটা থিসিস রেখে বলল, “এই মনে কর হাতপাখা।” এমনি করে খানিকক্ষণ কি ভাবে আর ব্যাগ থেকে একটা করে গাবদা থিসিস বার করে রাখে, আর বলে, “এই মনে কর সেমিনার—” “এই মনে কর ডেঁপোদাদা বাতেলা দিচ্ছে—” “এই মনে কর সেই বাতেলা শুনে তোমার পোঁয়া পাকলো —”
এইরকম শুনতে-শুনতে শেষটায় আমার কেমন রাগ ধরে গেল। আমি বললাম, “দূর ছাই! কি সব আবোল তাবোল বকছে, একটুও ভালো লাগে না।”
স্কলার বলল, “আচ্ছা, তা হলে আর একটু সহজ করে বলছি। চোখ বোজ, আমি যা বলব, মনে মনে তার হিসেব কর।” আমি চোখ বুজলাম।
চোখ বুজেই আছি, বুজেই আছি, স্কলারের আর কোনো সাড়া-শব্দ নেই। হঠাৎ কেমন সন্দেহ হল, চোখ চেয়ে দেখি স্কলারটা ল্যাজ খাড়া করে বাগানের বেড়া টপকিয়ে পালাচ্ছে আর ক্রমাগত ফ্যাচ্ফ্যাচ্ করে হাসছে।

কি আর করি, গাছতলায় একটা পাথরের উপর বসে পড়লাম। বসতেই কে যেন ভাঙা-ভাঙা মোটা গলায় বলে উঠল, “IS আর SN-এ কত হয়?”
Image courtesy: Google

আমি ভাবলাম, এ আবার কে রে? এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, এমন সময় আবার সেই আওয়াজ হল, “কই জবাব দিচ্ছ না যে? IS আর SN-এ কত হয়?” তখন উপর দিকে তাকিয়ে দেখি, একটা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর শ্লেট পেনসিল দিয়ে কি যেন লিখছে, আর এক-একবার ঘাড় বাঁকিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে।
আমি বললাম, "IS আর SN-এ ISSN।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটা অমনি দুলে-দুলে মাথা নেড়ে বলল, “হয় নি, হয় নি, ফেল্।”
আমার ভয়ানক রাগ হল। বললাম, “নিশ্চয় হয়েছে। I, S, S, N। সব মিলে ISSN।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটা কিছু জবাব দিল না, খালি পেনসিল মুখে দিয়ে খানিকক্ষণ কি যেন ভাবল। তার পর বলল, IS আর SN-এ প্রোমোশনের প্রো, হাতে রইল মোশন!”
আমি বললাম, “তবে সোজা কথাতেই বললে পারতে যে প্রোমোশন হবে কিনা জানতে চাইছ। বলে দিতাম।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “তুমি যখন বলেছিলে, তখনো পুরো প্রোমোশনের পেপার তৈরি হয় নি। তখন বিকাশ ভবনের তেরো নম্বর ঘরের একাশি নম্বর টেবিলের আট নম্বর বাবু চা-পানের নামে অফিস কেটে জাপান চলে গিয়েছিলেন বলে একানব্বইটা ফাইল ওই টেবিলে আটকে ছিল। আমি যদি ঠিক সময় বুঝে ধাঁ করে মোশনটাকে হাতে না নিয়ে ফেলতাম, তা হলে এতক্ষণে বাবু জাপান হয়ে কাম্বোডিয়া পেরিয়ে হনলুলু গিয়ে মরে যেতেন পট করে।”
আমি বললাম, “এমন আনাড়ি কথা তো কখনো শুনি নি। প্রোমোশন যদি হওয়ার হয়, তাহলে বাবু জাপান যান আর হনলুলু যান আর মরে যান, সে তো হবেই।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটা ভারি অবাক হয়ে বলল, “তোমাদের দেশে প্রোমোশনের দাম নেই বুঝি?”
আমি বললাম, “প্রোমোশনের দাম কিরকম?”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “এখানে কদিন থাকতে, তা হলে বুঝতে। আমাদের বাজারে প্রোমোশন এখন ভয়ানক মাগ্যি, এতটুকু জিরোবার জো নেই। শুধু পয়েন্ট বাড়ালে চলে না, কাঠি করা মাস্ট। এই তো কদিন খেটেখুটে কিছু কাঠির প্ল্যান জমিয়েছিলাম, তাও তোমার সঙ্গে তর্ক করতে অর্ধেক ভেস্তে গেল।” বলে সে আবার হিসেব করতে লাগল। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বসে রইলাম।
এমন সময়ে হঠাৎ গাছের একটা ফোকর থেকে কি যেন একটা সুড়ুৎ করে পিছলিয়ে মাটিতে নামল। চেয়ে দেখি, দেড় হাত লম্বা এক বুড়ো, তার পা পর্যন্ত সবুজ রঙের দাড়ি, হাতে একটা হুঁকো তাতে কলকে-টলকে কিচ্ছু নেই, আর মাথা ভরা টাক। টাকের উপর খড়ি দিয়ে কে যেন কি-সব লিখেছে।
বুড়ো এসেই খুব ব্যস্ত হয়ে হুঁকোতে দু-এক টান দিয়েই জিজ্ঞাসা করল, “কই চেয়ারটা হল? আমাকে যে চেয়ার প্রফেসর যে বানিয়ে রেখেছ, বলি চেয়ারটা কোথায়? সেটা তৈরি হল?”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর খানিক এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, “এই হল বলে।”
বুড়ো বলল, “কি আশ্চর্য! উনিশ দিন পার হয়ে গেল, এখনো চেয়ারটা হয়ে উঠল না?”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর দু-চার মিনিট খুব গম্ভীর হয়ে পেনসিল চুষল তার পর বলল, “উনিশ দিনে এখন একটা লেকচার নামতে চায় না, আর উনি চেয়ার নামাবেন!” তারপর গলা উঁচিয়ে হেঁকে বলল, “লাগ্ লাগ্ লাগ্ কুড়ি।”
বুড়ো বলল, “একুশ।” অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “বাইশ।” বুড়ো বলল, “তেইশ।” অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “সাড়ে তেইশ।” ঠিক যেন নিলেম ডাকছে।
ডাকতে-ডাকতে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটা হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি ডাকছ না যে?”
আমি বললাম, “খামকা ডাকতে যাব কেন?”
বুড়ো এতক্ষণ আমায় দেখে নি, হঠাৎ আমার আওয়াজ শুনেই সে বন্‌বন্ করে আট দশ পাক ঘুরে আমার দিকে ফিরে দাঁড়াল।
তার পরে হুঁকোটাকে দূরবীনের মতো করে চোখের সামনে ধরে অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার পর পকেট থেকে কয়েকখানা রঙিন কাঁচ বের করে তাই দিয়ে আমায় বার বার দেখতে লাগল, আর খালি বলতে লাগল, “বাঃ! স্কলারের পূর্ণ স্বরূপ!”। তার পর কোত্থেকে একটা পুরনো জ্যামিতি বাক্স এনে তার থেকে চাঁদা বার করে সে আমাকে খুব কাছ থেকে মাপতে শুরু করল, আর হাঁকতে লাগল, “চোখ একশো-আশি ডিগ্রী, , আস্তিন একশো-আশি ডিগ্রী, ছাতি একশো-আশি ডিগ্রী, গলা একশো-আশি ডিগ্রী।”
আমি ভয়ানক আপত্তি করে বললাম, “এ হতেই পারে না। বুকও একশো-আশি ডিগ্রী, গলাও একশো-আশি ডিগ্রী? আমি কি প্যানপ্টিকন?”
বুড়ো বলল, “বিশ্বাস না হয়, দেখ।”
দেখলাম চাঁদার লেখা-টেখা সব উঠে গিয়েছে, খালি ১৮০ লেখাটা একটু পড়া যাচ্ছে, তাই বুড়ো যা কিছু মাপে সবই একশো-আশি ডিগ্রী হয়ে যায়।
তার পর বুড়ো জিজ্ঞাসা করল, “স্পেশালাইজেশন কিসে?”
আমি বললাম, “কবিতা!”
বুড়ো তার দুটো আঙুল দিয়ে আমায় একটুখানি টিপে-টিপে বলল, “উঁহু। তোমার স্পেশালাইজেশন হল পোস্টমডার্ন সাহিত্যে গাজরের ভুমিকার ওপর। কিন্তু রেনেসাঁ না হলে তো আমরা পিএইচডি-তে নিই না।”
আমি বললাম, “বয়েই গেছে তোমাদের পিএইচডি-তে ঢুকতে আমার।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটা অমনি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “সে রেনেসাঁর সময়ও গাজর পাওয়া যেত। অসুবিধে হবে না ভাই।”
বুড়ো বলল, “তা হলে লিখে নাও— স্পেশালাইজেশন গাজর, বয়েস সাঁইত্রিশ।”
আমি বললাম, “দূৎ! আমার বয়স হল ছাব্বিশ বছর তিনমাস, বলে কিনা সাঁইত্রিশ।”
বুড়ো খানিকক্ষণ কি যেন ভেবে জিজ্ঞাসা করল, “একটা পেপার একবার ছাপাও না বারবার?”
আমি বললাম, “সে আবার কি?”
বুড়ো বলল, “বলি পেপার একবার লিখে ক’জায়গায় পাবলিশ করো?”
আমি বললাম, “ক’জায়গা আবার কি? পেপার কি একবার বই দুবার ছাপাবো নাকি?”
বুড়ো বলল, “তা নয় তো কেবলই নতুন নতুন পেপার লিখে চলবে নাকি? তা হলেই তো গেছি! কোনদিন দেখব খাটতে খাটতে একেবারে নাদুস চেহারাটা কঙ্কাল হয়ে গেছে। শেষটায় অরিজিন্যালিটির আনার লোভে মরি আর কি!" বলেই কিছুক্ষণ মাথা চুলকে অনেক ভেবে আবার বলল, "আমাদের এখানে স্কলাররা কেমন হয় শুনবে? শোনো তবে --
বিদঘুটে স্কলার ওই, কিমাকার কিম্ভূত
সারাদিন ধরে তার শুনি শুধু খুঁতখুঁত
ইস্কুল চেয়ে বেশি কলেজেই প্রেফারেন্স
ঘ্যানঘ্যান লেকচার, ঘন ঘন রেফারেন্স
এটা চাই, ওটা চাই, কত তার বায়না
হাইকুর সূত্র কি? জাপান? না চায়না?
কোলরিজ-সম তার গাঁজা চাই আহারে
কিটসীয় ফ্যানি চাই রূপে-রঙে-বাহারে
এদিকে তো বসে বসে আমিনিয়া-জীশানেই
কেঁদে ওঠে হাউহাউ, কেন তার ভিসা নেই?
সবে গেল লন্ডনে, ভিয়েনা ও ভেনিসে
এমন কি ও’ পাড়ার সেদিনের টেনি, সে
এসে বলে তাকে, আহা, বিদেশের পেপারে
হাততালি পেয়ে এনু, বলো, এত কে পারে?
শিরশিরে রাগ ওঠে, লেখনীতে জোর চাই,
লেখা পড়ে আপনার বলে “উঁহু দূর ছাই!”
কাফকার মতো তার আলো চাই আঁধারে,
বোরহেসের ফিকশন কি জটিল ধাঁধা রে!
অ্যাভনের বুড়ো কবি, তারও নেই রক্ষে
ফাঁক পেলে ঢুকে পড়ে জয়েসের কক্ষে।
ড্রাইডেন পোপ দেখো স্যাট্যারায় দুজনে,
শেলী-মন দরদিছে স্কাইলার্ক কুজনে!
আমাকেও হতে হবে বিশারদ পাণ্ডা
লক থেকে লাকাঁতে, হাতে নিয়ে ঝাণ্ডা।
তালি দিয়ে লোকজন যাবে মোর সঙ্গে,
অ্যায়সান নাম হবে বিলাতে ও বঙ্গে!
এতকিছু হলে তবে মেটে তার প্যাখনা,
যারে পায়, তারে বলে, মোর দশা দ্যাখ না!
‘যাদু’ আছে, ‘ক্যালু’ আছে, আছে রবি ভারতী,
আমাকেও এনে দে না শ্লোক পড়া সারথী!
কেঁদে কেটে শেষটায় আষাঢ়ের বাইশে
হল বিনা চেষ্টায় চেয়েছে যা, তাই সে।
ভুলে গিয়ে পড়াশুনো, এক কোণে একা সে,
চুপ করে বসে থাকে, মুখখানা ফ্যাকাসে
ছাতামাথা ভাবে খালি হিজিবিজি লেখে তায় –
জনসন-বসওয়েলে বিঁড়ি খেতে কোথা যায়?
শেলী পড়ে কাফকামি করা মোরে সাজে কি?
কামু যদি পেন ধরে, ডার্ক লেডি বাঁচে কি?
হোরেস আর বোরহেসেতে মিল পাব কিভাবে?
আমাকে কি কেউ কভু হাত ধরে জিগাবে,
ফ্যানি আর মড গনে দেখা কেন হয়নি?
ড্রাইডেন শ্যাডওয়েল হাওয়া খেতে যায়নি?
কেউ যদি রেগে মেগে বলে মোর সামনেই,
কোথাকার কে রে তুই? নাম নেই, ধাম নেই!
জবাবে কি বলব, সে জানিনা তো আমি আজ,
বুক করে হু হু আর মাথা জুড়ে পড়ে বাজ!
সবে জানে আমি শুধু নাম ধাম শুনিয়ে
ধরে রাখি লোকজন গপ্পো টা ধুনিয়ে।
যদিও বেকুবে মোরে শুনে বলে, কেয়াবাত!
আসলে তো আমি শুধু সব ঘটে চালিয়াৎ!”

সব শুনে-টুনে আমি বললাম, "সে সব তো না হয় বুঝলাম। কিন্তু রিসার্চে অরিজিনাল হতে গেলে নতুন নতুন পেপার লিখতে হবে না?”
বুড়ো বলল, “তোমার যেমন বুদ্ধি! অরিজিনাল পেপার নতুন হবে কেন? একটা পেপারের পাবলিকেশন চল্লিশবার হলেই আমরা শব্দের নতুন নতুন সিনোনিম ওই পেপারগুলোয়ে বসাতে শুরু করে দিই। তখন আর একচল্লিশ বেয়াল্লিশ হয় না— উনচল্লিশ, আটত্রিশ, সাঁইত্রিশ করে অন্য পথে যেতে থাকে। এমনি করে যখন দশ পর্যন্ত নামে, তদ্দিনে লোকে প্রথম চল্লিশটা পেপার ভুলে যায়, তখন আবার পুরোনো সিনোনিমগুলো টুকতে শুরু করি। আমার পেপার তো কত উঠল নামল আবার উঠল, এখন আমার পেপারের সংখ্যা হয়েছে তেরো, পাবলিকেশন ছয়শো বাহাত্তর।” শুনে আমার ভয়ানক হাসি পেয়ে গেল।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “তোমরা একটু আস্তে আস্তে কথা কও, আমার পেপারটা চট্‌পট্ সেরে নি।”
বুড়ো অমনি চট্ করে আমার পাশে এসে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে ফিস্‌ফিস্ করে বলতে লাগল, “একটা চমৎকার রিসার্চ এরিয়া বলব। দাঁড়াও একটু ভেবে নি।” এই বলে তার হুঁকো দিয়ে টেকো মাথা চুলকাতে-চুলকাতে চোখ বুজে ভাবতে লাগল। তার পর হঠাৎ বলে উঠল, “হ্যাঁ, মনে হয়েছে, শোনো—
“তার পর এদিকে ফুকো তো চমস্কির গুলিসুতো খেয়ে ফেলেছে। কেউ কিচ্ছু জানে না। ওদিকে ইডিপাসটা করেছে কি, ঘুমুতে-ঘুমুতে হাঁউ-মাঁউ-কাঁউ, ফ্রয়েডের গন্ধ পাঁউ বলে হুড়্ মুড়্ করে খাট থেকে পড়ে গিয়েছে। অমনি ঢাক ঢোল সানাই কাঁশি লোক লস্কর সেপাই পল্টন হৈ-হৈ রৈ-রৈ মার্-মার্ কাট্-কাট্— এর মধ্যে একজন ক্রিটিকাল থিঙ্কার বলে উঠলেন, ‘ওয়ার্ল্ড যদি হবে, তা হলে তা থার্ড নয় কেন?’ শুনে পাত্র মিত্র স্তাবক অস্তাবক আক্কেল মক্কেল সবাই বললে, ‘ভালো কথা! থার্ড নয় কেন?’ কেউ তার জবাব দিতে পারে না, সুড়্‌সুড়্ করে পালাতে লাগল।”
এমন সময় অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “বিজ্ঞাপন পেয়েছ? হ্যাণ্ডবিল?”
আমি বললাম, “কই না, কিসের বিজ্ঞাপন?” বলতেই অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটা একটা কাগজের বাণ্ডিল থেকে একখানা ছাপানো কাগজ বের করে আমার হাতে দিল, আমি পড়ে দেখলাম তাতে লেখা রয়েছে—
শ্রীশ্রীযমদ্বারায়ঃ নমঃ
শ্রীচুক্‌লিবাজ চুকচুকে অ্যাসোসিয়েশন
(M.A., B.Ed., M.Phil)
--------------------
আমরা হিসাবী ও বেহিসাবী খুচরা ও পাইকারী সকলপ্রকার ছাত্রছাত্রীর ডক্টরেট থিসিস লিখিবার স্বপ্ন কল্পতরু প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করিয়া থাকি। মূল্য এক ইঞ্চি ১৷৴৹। BACK CANDIDATE HALF PRICE অর্থাত্‍‌ ফেল্টুশ-দের অর্ধমূল্য। আপনার মগজের এক্স-রে, পদবী, নেট-ফেল কি না, জীবিত কি মৃত, ইত্যাদি আবশ্যকীয় বিবরণ পাঠাইলেই ফেরত ডাকে থিসিস পাঠাইয়া থাকি।
সাবধান! সাবধান!! সাবধান!!!
আমরা সনাতন চৌর্যবংশীয় দাঁড়িকুলীন, অর্থাত্‍‌ দাঁড়অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। আজকাল নানাশ্রেণীর পাতিঅ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, হেঁড়েঅ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, রামঅ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর প্রভৃতি নীচশ্রেণীর জাতিরাও অর্থলোভে নানারূপ ব্যবসা চালাইতেছে। সাবধান! তাহাদের বিজ্ঞাপনের চটক দেখিয়া প্রতারিত হইবেন না।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “কেমন হয়েছে?”
আমি বললাম, “সবটা তো ভালো করে বোঝা গেল না।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর গম্ভীর হয়ে বলল, “হ্যাঁ, ভারি শক্ত, সকলে বুঝতে পারে না। একবার এক স্কলার এয়েছিল তার ছিল টেকো মাথা—”
এই কথা বলতেই বুড়ো মাৎ-মাৎ করে তেড়ে উঠে বলল, “দেখ্! ফের যদি আমার স্কলারকে টেকো মাথা বলবি তো হুঁকো দিয়ে এক বাড়ি মেরে তোর শ্লেট ফাটিয়ে দেব।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর একটু থতমত খেয়ে কি যেন ভাবল, তার পর বলল, “টেকো নয়, তেলো মাথা, যে মাথা তেল মারার প্ল্যান ভাঁজতে ভাঁজতে তেলতেলে হয়ে গিয়েছে।”
বুড়ো তাতেও ঠাণ্ডা হল না, বসে-বসে গজ্‌গজ্ করতে লাগল। তাই দেখে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “পেপারটা দেখবে নাকি?”
বুড়ো একটু নরম হয়ে বলল, “হয়ে গেছে? কই দেখি।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর অমনি “এই দেখ” বলে তার শ্লেটখানা ঠকাস্ করে বুড়োর টাকের উপর ফেলে দিল। বুড়ো তৎক্ষণাৎ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল আর ছোটো ছেলেদের মতো ঠোট ফুলিয়ে “ও মা, ও স্পিভাকপিসি, ওরে ভাবা রে” বলে হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদতে লাগল।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে, বলল, “লাগল নাকি! ষাট-ষাট।”
বুড়ো অমনি কান্না থামিয়ে বলল, “একষট্টি, বাষট্টি, চৌষট্টি—”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “পঁয়ষট্টি।”
আমি দেখলাম আবার বুঝি ডাকাডাকি শুরু হয়, তাই তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, “কই পেপারটা তো দেখলে না?”
বুড়ো বলল, “হ্যাঁ-হ্যাঁ তাই তো! কি পেপার হল পড় দেখি।”
আমি শ্লেটখানা তুলে দেখলাম ক্ষুদে-ক্ষুদে অক্ষরে অনেক কিছু লেখা রয়েছে, তার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যায় না। অর্ধেকের বেশি জায়গা ভুলে ভরা।
আমার পড়া শেষ না হতেই বুড়ো বলে উঠল, “এ-সব কি লিখেছ আবোল তাবোল -- 'This paper is a showcase of gratitude to the seminar convenor' -- কি এসব?”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “ও-সব লিখতে হয়। তা না হলে সেমিনারে পেপার টিকবে কেন? ঠিক চৌকস-মতো কাজ করতে হলে কেরিয়ারের শুরুতে এসব করে নিতে হয়।”
বুড়ো বলল, “তা বেশ করেছ, কিন্তু আসল পেপারটা কি হল তা তো বললে না?”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “হ্যাঁ, তাও তো বলা হয়েছে। ওহে, শেষ দিকটা পড় তো। পেপারটা পড়েই বোঝা যাচ্ছে সমস্যাটা রোম্যান্টিকও নয়, ক্ল্যাসিকালও নয়। সুতরাং হয় এটার শেষ হবে ফেমিনিজমে, নাহয় ইকোক্রিটিসিজমে। পরীক্ষা করে দেখলাম ওই বিব্লিওগ্রাফির জায়গাটা হচ্ছে অরজিন্যাল। তা হলে বাকি পেপারটা কি হল তাতে কিছু যায় আসে না। এখন আমার জানা দরকার, তোমরা তোমরা ফেমিনিস্ট শেষ চাও না ইকোক্রিটিকাল চাও?”
বুড়ো বলল, আচ্ছা দাঁড়াও, তা হলে একবার জিজ্ঞাসা করে নি।” এই বলে সে নিচু হয়ে গাছের গোড়ায় মুখ ঠেকিয়ে ডাকতে লাগল, “ওরে পাবলিশার! পাবলিশার রে!”
খানিক পরে মনে হল কে যেন গাছের ভিতর থেকে রেগে বলে উঠল, “কেন ডাকছিস?”
বুড়ো বলল, “চুকলিবাজটা কি বলছে শোন্।”
আবার সেইরকম আওয়াজ হল, “কি বলছে?”
বুড়ো বলল, “বলছে, ফেমিনিস্ট না ইকোক্রিটিকাল?”
তেড়ে উত্তর হল, “কাকে বলছে ফেমিনিস্ট ? তোকে না আমাকে?”
বুড়ো বলল, “তা নয়। বলছে, শেষটা ফেমিনিস্ট চাস, না ইকোক্রিটিকাল?”
একটুক্ষণ পর জবাব শোনা গেল, “আচ্ছা,ইকোক্রিটিকাল দিতে বল।”
বুড়ো গম্ভীরভাবে খানিকক্ষণ দাড়ি হাতড়াল, তার পর মাথা নেড়ে বলল, “পাবলিশারটার যেমন বুদ্ধি! ইকোক্রিটিকাল দিতে বলব কেন? ফেমিনিস্ট খারাপ হল কিসে? না হে চুকলিবাজ, তুমি ফেমিনিস্টই দাও।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “তা হলে ফেমিনিজমের ফেমিন, অর্থাৎ কিনা দুর্ভিক্ষ বাদ গেলে পড়ে থাকে ইজম। তার মানে হল গিয়ে আজকালকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মেয়েগুলোর সেলফি তোলা দেখে যে থিওরি, সেটাই ফেমিনিজম। এই হল আমার আজকের পেপারের অরিজিনাল ভিউ।”
বুড়ো বলল, “আমি যখন কাঁদছিলাম, তখনই ভেবে রেখেছিলাম তোমাকে আমি বিদ্যারত্ন সম্মান দেব। এই নাও তোমার শ্লেট।”
শ্লেট পেয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের মহাফুর্তি! সে ‘টাক্-ডুমাডুম্ টাক্-ডুমাডুম্’ বলে শ্লেট বাজিয়ে নাচতে লাগল।
বুড়ো অমনি আবার তেড়ে উঠল, “ফের টাক-টাক বলছিস্? দাঁড়া। ওরে পাবলিশার রে! শিগ্‌গির আয়। আবার টাক বলছে।” বলতে-না-বলতেই গাছের ফোকর থেকে মস্ত একটা পোঁটলা মতন কি যেন হুড়্‌মুড়্ করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। চেয়ে দেখলাম, একটা বুড়ো লোক একটা প্রকাণ্ড বোঁচকার নীচে চাপা পড়ে ব্যস্ত হয়ে হাত-পা ছুঁড়ছে! বুড়োটা দেখতে অবিকল এই হুঁকোওয়ালা বুড়োর মতো। হুঁকোওয়ালা কোথায় তাকে টেনে তুলবে না সে নিজেই পোঁটলার উপর চড়ে বসে, “ওঠ্ বলছি, শিগ্‌গির ওঠ্। এই বোঁচকাবন্দী গাদাখানেক থিসিস আর কবে ছাপাবি? আর না ছাপাতে পারিস তো প্রতিটা থিসিস পিছু আমি যে তোকে ১০ টাকা করে কমিশন দিয়েছিলাম, এখুনি ফেরত দে। ” বলে ধাঁই-ধাঁই করে তাকে হুঁকো দিয়ে মারতে লাগল।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর আমার দিকে চোখ মট্‌কিয়ে বলল, “ব্যাপারটা বুঝতে পারছ না? এর স্কলারদের ভুলের বোঝা এখন পাবলিশারের ঘাড়ে। শুরুতে ছাপাবে বলেছিল, কিন্তু এখন বলছে এসব ছাপানোর চেয়ে গাছ কেটে ছাগলকে খাইয়ে দেওয়া ভালো। এই নিয়ে রোজ মারামারি হয়।”
এই কথা বলতে-বলতেই চেয়ে দেখি, পাবলিশার তার পোঁটলাসুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েই সে পোঁটলা উঁচিয়ে দাঁত কড়্‌মড়্ করে বলল, “তবে রে ইস্‌টুপিড্ চেয়ার প্রোফেসর!” উধোও আস্তিন গুটিয়ে হুঁকো বাগিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল, “তবে রে লক্ষ্মীছাড়া পাবলিশার!”
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বলল, “লেগে যা, লেগে যা— নারদ-নারদ!”
অমনি ঝটাপট্, খটাখট্, দমাদম্, ধপাধপ্! মুহূর্তের মধ্যে চেয়ে বুড়ো চিৎপাত শুয়ে হাঁপাচ্ছে, আর পাবলিশার ছট্‌ফট্ করে টাকে হাত বুলোচ্ছে।
পাবলিশার কান্না শুরু করল, “ওরে ভাই রে, তুই এখন কোথায় গেলি রে?”
বুড়ো কাঁদতে লাগল, “ওরে হায় হায়! আমাদের এত সাধের পাবলিকেশনের কি হল রে!”
তার পর দুজনে উঠে খুব খানিক গলা জড়িয়ে কেঁদে, আর খুব খানিক কোলাকুলি করে, দিব্যি খোশমেজাজে গাছের ফোকরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তাই দেখে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরটাও তার দোকানপাট বন্ধ করে কোথায় যেন চলে গেল।

আমি ভাবছি এইবেলা পথ খুঁজে বাড়ি ফেরা যাক, এমন সময় শুনি পাশেই একটা ঝোপের মধ্যে কিরকম শব্দ হচ্ছে, যেন কেউ হাসতে হাসতে আর কিছুতেই হাসি সামলাতে পারছে না। উঁকি মেরে দেখি, একটা মানুষ— বিবাহিত না অবিবাহিত, স্নান করা না ময়লা, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না— খালি হাত-পা ছুঁড়ে হাসছে, আর বলছে, “এই গেল গেল— নাড়ি-ভুঁড়ি সব ফেটে গেল!”
হঠাৎ আমায় দেখে সে একটু দম পেয়ে উঠে বলল, “ভাগ্যিস তুমি এসে পড়লে, তা না হলে আর একটু হলেই হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাচ্ছিল।”
আমি বললাম, “তুমি এমন সাংঘাতিক রকম হাসছ কেন?”
মানুষটা বলল, “কেন হাসছি শুনবে? মনে কর, পৃথিবীর কোনও কলেজে যদি ইউনিয়ন না থাকতো, আর সব ছাত্রছাত্রীগুলো যদি রোজ কলেজে আসতো, আর প্রফেসরদের যদি নিয়ম করে ক্লাসে যেতে হত, আর সেখানে যদি তাদের সত্যিকারের বিদ্যেবুদ্ধির পরিচয় দিতে হত, তা হলে— হোঃ হোঃ হোঃ হো—” এই বলে সে আবার হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল।
আমি বললাম, “কি আশ্চর্য! এর জন্য তুমি এত ভয়ানক করে হাসছ?”
সে আবার হাসি থামিয়ে বলল, “না, না, শুধু এর জন্য নয়। মনে কর, একজন প্রফেসর আসছে, তার এক হাতে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, আর-এক হাতে ‘কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট’, আর প্রফেসরটা বউকে ‘কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট’ দিতে গিয়ে ভুলে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ দিয়ে ফেলেছে— হোঃ হোঃ, হোঃ হো, হাঃ হাঃ হাঃ হা—” আবার হাসির পালা।
আমি বললাম, “কেন তুমি এই-সব অসম্ভব কথা ভেবে খামকা হেসে-হেসে কষ্ট পাচ্ছ?”
সে বলল, “না, না, সব কি আর অসম্ভব? মনে কর, একজন ভিসি পুলিশ পোষে, রোজ তাদের নাইয়ে খাইয়ে শুকোতে দেয়, একদিন একটা লোক এসে সব পুলিশগুলোকে ব্যায়াম করাতে লেগেছে— হোঃ হোঃ হোঃ হো—”
লোকটার রকম-সকম দেখে আমার ভারি অদ্ভুত লাগল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কে? তোমার নাম কি?”
সে খানিকক্ষণ ভেবে বলল, “আমার নাম গেস্ট লেকচারার। আমার নাম গেস্ট লেকচারার, আমার ভায়ের নাম গেস্ট লেকচারার, আমার বাবার নাম গেস্ট লেকচারার, আমার পিসের নাম গেস্ট লেকচারার—”
আমি বললাম, “তার চেয়ে সোজা বললেই হয় তোমার গুষ্টিসুদ্ধ সবাই গেস্ট লেকচারার।”
সে আবার খানিক ভেবে বলল, “তা তো নয়, আমার নাম হাভাতে! আমার মামার নাম হাভাতে, আমার খুড়োর নাম হাভাতে, আমার মেসোর নাম হাভাতে, আমার শ্বশুরের নাম হাভাতে—”
আমি ধমক দিয়ে বললাম, “সত্যি বলছ? না বানিয়ে?”
লোকটা কেমন থতমত খেয়ে বলল, “না না, আমার শ্বশুরের নাম টিউশনি।”
আমার ভয়ানক রাগ হল, তেড়ে বললাম, “একটা কথাও বিশ্বাস করি না।”
অমনি কথা নেই বার্তা নেই, ঝোপের আড়াল থেকে একটা মস্ত দাড়িওয়ালা আঁতেল হঠাৎ উঁকি মেরে জিজ্ঞাসা করল, “আমার কথা হচ্ছে বুঝি?”
আমি বলতে যাচ্ছিলাম ‘না’ কিন্তু কিছু না বলতেই তড়্তড়্ করে সে বলে যেতে লাগল, “তা তোমরা যতই তর্ক কর, এমন অনেক জিনিস আছে যা আঁতেলে বলে না। তাই আমি একটা বক্তৃতা দিতে চাই, তার বিষয় হচ্ছে— আঁতেলে কি না বলে।” এই বলে সে হঠাৎ এগিয়ে এসে বক্তৃতা আরম্ভ করল—
“হে বালকবৃন্দ এবং স্নেহের গেস্ট লেকচারার, আমার গলায় ঝোলানো সার্টিফিকেট দেখেই তোমরা বুঝতে পারছ যে আমার নাম শ্রী অশ্রুচাপা শ্মশ্রু, বি. এ. আঁতবিশারদ। সুযোগ দিলে আমি আঁতের নামে খুব চমৎকার ব্যা-ব্যা করতে পারি, তাই আমার পেট-নেম ব্যাকরণ। আমার বক্তব্যে ফিরে আসি। কোন-কোন জিনিস নিয়ে আঁত ঝাড়া যায় আর কোনটা-কোনটা নিয়ে যায় না, তা আমি সব নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি, তাই আমার উপাধি হচ্ছে আঁতবিশারদ। তোমরা যে বল— আঁতেলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়— এটা অত্যন্ত অন্যায়। এই তো একটু আগে এক হতভাগা বলছিল যে আঁতেল যা বলে, তার অর্ধেক জানে! এটা এক্কেবারে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমি অনেকরকম কথা বলে দেখেছি, আমি কিছুই জানি না। জানবার মতো কিছু নেইও। অবশ্যি আমি মাঝে-মাঝে এমন অনেক জেনে ফেলি, যা তোমরা জানো না, যেমন— ফুকোর আক্কেল দাঁতে কটা ফুটো ছিল, দেকার্ত ‘এর্গো’ আর ‘সুম’ বলার মাঝে নিশ্বাস নিয়েছিলেন কিনা, বোরহেস আর হোরেসের কোনও অবৈধ সম্পর্ক ছিল কিনা, যামিনী রায়ের ছবিতে তুমি লুক্কায়িত হেজিমনি খুঁজে পেলে তোমার সোনামণি রেগে যাবে কিনা, এসব। এই কারণেই মজবুত, বাঁধানো কোনো আর্গুমেন্ট আমরা কক্ষনো বিশ্বাস করি না। আমরা ক্বচিৎ কখনো সাহিত্য কিম্বা সাহিত্যিক এ-সব একটু আধটু বকি বটে, কিন্তু যারা বলে আমরা সাহিত্যের ছাত্র বা লিটারেচার স্কলার, তারা ভয়ানক মিথ্যাবাদী। আমরা বুঝি শুধু একটা জিনিস – কলচর। সাহিত্য, নাটক, কবতে, নভেল, আলু-পোস্ত, গিরগিটি, চুমু, মামু, আর্ট, রঞ্জিত মল্লিক, সবই হল কলচরের একেকটা প্রকাশ। যখন আমাদের মনে খুব তেজ আসে, তখন শখ করে অনেকরকম জিনিস আমরা পড়ে দেখি, যেমন, হজবরল কিম্বা অফ গ্রামাটোলজি কিম্বা জাপানি তেলের বিশদ বিবরণ। শুনেছি আমার এক আঁতুদাদা একবার ফুর্তির চোটে বক্তৃতা দিয়ে এক সাহেবের আধসের আয়ু কমিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বলে কেউ শুনতে না চাইলে আমরা জোর করে তাকে কখনই কিছু শোনাই না। কেউ-কেউ না বুঝেও শুনতে ভালোবাসে, কিন্তু তার সহ্যক্ষমতা বুঝেই আমরা শোনাই। আমার ছোটভাইকে একবার ভুল করে ফ্রেঞ্চ রেভলিউশনের সময়ে রোম্যান্টিক কবিদের জনান্তিকে বৃক্ষরোপণ উৎসব ও ভেড়াচাষের উপকারিতা নিয়ে একটু জ্ঞান দিয়ে ফেলেছিলাম—” বলেই আঁতেল আকাশের দিকে চোখ তুলে ব্যা-ব্যা করে ভয়ানক কাঁদতে লাগল। তাতে বুঝতে পারলাম যে সেই বক্তৃতা শুনে ভাইটির অকালমৃত্যু হয়েছিল।
গেস্ট লেকচারারটা এতক্ষণ পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল, হঠাৎ আঁতেলটার বিকট কান্না শুনে সে হাঁউ-মাঁউ করে ধড়্মড়িয়ে উঠে বিষম-টিষম খেয়ে একেবারে অস্থির! আমি ভাবলাম বোকাটা বুঝি মরে এবার! কিন্তু একটু পরেই দেখি, সে আবার তেমনি হাত-পা ছুঁড়ে ফ্যাক্ফ্যাক্ করে হাসতে লেগেছে।
আমি বললাম, “এর মধ্যে আবার হাসবার কি হল?”
সে বলল, “সেই একজন লোক ছিল, সে মাঝে-মাঝে এমন ভয়ংকর সব উচ্চারণ করতো যে সবাই তার উপর চটা ছিল! একদিন তার গ্যাস বেলুন ফেটে শুঁই-শুঁই করে হাওয়া বেরোতে লেগেছে, আর অমনি সবাই দৌড়ে তাকে দমাদম মারতে শুরু করেছে— হোঃ হোঃ হোঃ হো—”
আমি বললাম, “যত-সব বাজে কথা।”

এই বলে যেই ফিরতে গেছি, অমনি চেয়ে দেখি একটা নেড়ামাথা কে-যেন যাত্রার জুড়ির মতো চাপকান আর পায়জামা পরে হাসি-হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে আমার গা জ্বলে গেল। আমায় ফিরতে দেখেই সে আবদার করে আহ্লাদীর মতো ঘাড় বাঁকিয়ে দুহাত নেড়ে বলতে লাগল, “না ভাই, না ভাই, এখন আমায় কোনও কনসেপ্ট নোট লিখতে বোলো না। সত্যি বলছি, আজকে আমার কনসেপ্ট একদম ক্লিয়ার নেই।”
আমি বললাম, “কি আপদ! কে তোমায় লিখতে বলছে?”
লোকটা এমন বেহায়া, সে তবুও আমার কানের কাছে ঘ্যান্ঘ্যান্ করতে লাগল, “রাগ করলে? হ্যাঁ ভাই, রাগ করলে? আচ্ছা নাহয় দু’ কলি কনসেপ্ট শুনিয়েই দিচ্ছি, রাগ করবার দরকার কি ভাই?”
আমি কিছু বলবার আগেই আঁতেলটা আর্ গেস্ট লেকচারারটা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “এই তো, বারোয়ারি কনভেনর এসে গেছে। হোক হোক, কনসেপ্ট হোক।” অমনি নেড়াটা তার কোত্থেকে একটা গিটার বার করলো। তার ছ’টা তারের মধ্যে একটাই অবশিষ্ট আছে, সেটাকেই টেনে টেনে পিং-পিং আওয়াজ বার করতে করতে গুনগুন করে হঠাৎ সরু গলায় চীৎকার করে গান ধরল— “লাল গানে নীল সুর, হাসি হাসি গন্ধ।”
ঐ একটিমাত্র পদ সে একবার গাইল, দুবার গাইল, পাঁচবার, দশবার গাইল।
আমি বললাম, “এ তো ভারি উৎপাত দেখছি, গানের কি আর কোনো পদ নেই?”
নেড়া বলল, “আহা এটা তো শুধু সাব-থীম গুলো বলছি, যার ওপর অ্যাব্‌সট্রাক্ট পড়বে। আগে সেগুলো শুনে নাও। কনসেপ্ট তো পরে। আরেকটা সাব-থীম আছে, আমার খুব প্রিয়। সেটা হচ্ছে— অলিগলি বিধি বাম, বাকি সব গডড্যাম, কালি দিয়ে চুনকাম। সেটা আজকাল খুব বেশি দিই না। আরেকটা আছে, ছোট্ট থীম, কিন্তু ক্রুশিয়াল— পুড়কি দিলেই পড়তে পারি — সেটা খুব পড়াশুনো করে লিখতে হয়। তাই সেটাও আজকাল আর দিতে পারি না।
আমি বললাম, “এ আবার থীম হল নাকি? এর তো মাথামুণ্ডু কোনো মানেই হয় না।”
গেস্ট লেকচারার বলল, “হ্যাঁ, ভারি শক্ত।”
আঁতেল বলল, “শক্ত আবার কোথায়? অ্যাব্‌সট্রাক্টের থীম অ্যাব্‌সট্রাক্ট হবে না তো কি কনক্রিট হবে নাকি? ”
নেড়াটা খুব অভিমান করে বলল, “তা, তোমরা সহজ থীম শুনতে চাও তো সে কথা বললেই হয়। অত কথা শোনাবার দরকার কি? আমি কি আর সহজ করে বোঝাতে পারি না?” এই বলে সে বলতে শুরু করল—
“তাহলে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, শেক্সপীয়রের সময়ে বাঁধাকপির চচ্চড়িতে বড় এলাচ দেওয়া যেত কিনা। যদি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো যায়, দেখা যাবে ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন রাজারা দারুচিনি দেওয়া গুরুপাক খেলে যুদ্ধে হেরে যান। কিন্তু বড় এলাচ নিয়ে, সত্যি বলতে কি, উনি কোনও কথাই বলেন নি। বলা ভালো, সে সময়ের অনেক ঐতিহাসিকই বড় এলাচ নিয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে নিশ্চুপ। পরে যদিও বিংশ শতাব্দীতে সার্ত্র একবার মৃত্যুর প্রাক্কালে দিশি আমড়ার চাটনি খেতে খেতে বলেছিলেন - সমস্তটাই বিইং, নাথিংনেস বলে কিছু হয় না, তবে তার ওপর ভিত্তি করে কোনও বিশেষ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না, কারণ সার্ত্র তখন একটা বোকা লোলচর্মসার বুড়ো। তবে এখান থেকে একটা খুব দরকারি প্রশ্ন উঠে আসতে পারে, যার প্রয়োজনীয়তা প্রায় বড় এলাচের মতোই। সেটা হল – সার্ত্রের কাছে যে আমড়াটা দিশি, সেটা কি আমাদের কাছেও দিশি? নাকি বিদিশি? আমি গত পুজোয় এই বিষয়ে কালচারাল কোশ্চেন অ্যান্ড দ্য আইডিয়া অফ থার্ড স্পেস বিষয়ে একটা পেপার করে অনেকের পা-তালি পেয়েছিলাম।”
আমি বললাম, “একটা কথারও কোনও মানে হয় না।”
নেড়া বলল, “কেন হবে না— আলবৎ হয়।”
আঁতেল বলল, “আহা চলুক না, হয় কি না হয় পরে দেখা যাবে।” অমনি আবার শুরু হল—
“আসল কথা হল খ্যাতনামা অশ্রুতপূর্ব কবি-গদ্যকার-সমাজসেবী ইন্দুপুল্লু গুচ্চিকিলি গতমাসে মধ্যযুগের ওপর তাঁর করা একটা দারুণ অরিজিনাল পেপারে ক্লেম করেছেন, সে সময় হাই-ড্রেন ওপেন রাখা আসলে ক্যাথোলিক চার্চের কূটনীতির একটি অংশ। হাই-ড্রেন খোলা মানেই নোংরা জল, আর নোংরা জল মানেই বিভিন্ন রোগের জীবাণু। জীবাণুরা যতই জীবাণু হোক, আসলে তো তারা জীব। কাজেই এখান থেকে আমাদের সামনে নতুন দরজা খুলে গেল – অ্যানিম্যাল স্টাডিজ। এই এক কালচারাল স্টাডির ভাই হয়েছে। সেই অমোঘ সকালে রবীন্দ্রনাথ বলিপ্রথার বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন, “এত রক্ত কেন?”, এসব তো অ্যানিম্যাল স্টাডিজ! বুঝতে হবে তো!”
ভাটটা আরো চলত কি না জানি না, কিন্তু এইপর্যন্ত হতেই একটা গোলমাল শোনা গেল। তাকিয়ে দেখি আমার চারদিকে একটা সেমিনার শুরু হয়ে গিয়েছে। একটা পেপার প্রেজেন্টার বসে বসে ফোঁৎ ফোঁৎ করে কাঁদছে আর একটা বোকা মতো সুপারভাইজার মস্ত একটা ফাইল নিয়ে আস্তে-আস্তে তার পিঠ থাবড়াচ্ছে আর ফিসফিস্ করে বলছে, “কেঁদো না, কেঁদো না, সব ঠিক করে দিচ্ছি।” হঠাৎ একটা তকমা-আঁটা সেন্ট-মাখা সঞ্চালক হ্যান্ডমাইক নিয়ে চীৎকার করে বলে উঠল— “মানহানির মোকদ্দমা।”
অমনি কোত্থেকে একটা শুকনো, চিমড়ে প্রফেসর এসে “আমিই এই সেশনের চেয়ার” বলে মঞ্চের ওপর একটা চেয়ারে বসেই চোখ বুজে ঢুলতে লাগল, আর কনভেনর, মানে নেড়াটা ছুটে গিয়ে একটা বিশ্রী নোংরা হাতপাখা দিয়ে তাকে বাতাস করতে লাগল।
প্রফেসর একবার ঘোলা-ঘোলা চোখ করে চারদিকে তাকিয়েই তক্ষুনি আবার চোখ বুজে বলল, “উই উইল টেক দ্য কোয়েশ্চেনস অ্যাট দ্য এন্ড। নেক্সট পেপার প্লিজ।”
বলতেই সুপারভাইজারটা অনেক কষ্টে কাঁদো-কাঁদো মুখ করে চোখের মধ্যে নখ দিয়ে খিমচিয়ে পাঁচ ছয় ফোঁটা জল বার করে ফেলল। তার পর সর্দিবসা মোটা গলায় বলতে লাগল, “ধর্মাবতার চেয়ার! এটা মানহানি। আমার স্কলার শুধু এ দেশের নয়, এ পৃথিবীর অন্যতম সেরা বক্তা। সে প্রথম পুরস্কার পাবে, এ ব্যাপারে আশ্বাস পেয়েই সে এই ঢপের সেমিনারে পেপার পড়তে এসেছিল। কিন্তু আগের ওই পচা স্কলার ৫ মিনিট বেশি সুযোগ পাওয়ায় আমার স্কলারকে ৫ মিনিট কম দেওয়া হয়েছে। আমরা যারা ওস্তাদের মার শেষ রাতে পন্থায় বিশ্বাসী, তারা শেষ ৫ মিনিটেই সমস্ত অরিজিনালিটি লুকিয়ে রাখি। কাজেই, অরিজিনালিটি প্রকাশের সুযোগ না দিয়ে আমার এই ফুলের মতো স্কলারের মানে আঘাত করা হয়েছে। সুতরাং প্রথমেই বুঝতে হবে মান কাকে বলে। মান মানে টমাস। টমাস মান অতি উপাদেয় লেখক। সুতরাং বিষয়টার একেবারে মূল পর্যন্ত যাওয়া দরকার।”
এইটুকু বলতেই চেয়ার ঘুমের মাঝে কোনওরকমে বলে উঠলো, “শেষ পাঁচ মিনিটের অরিজিনালিটি শোনানোর সুযোগ দেওয়া হল।” শুনে প্রেজেন্টারটা আবার আনন্দে ফ্যাঁৎফ্যাঁৎ করে কাঁদতে যাচ্ছিল, কিন্তু সুপারভাইজার সেই প্রকাণ্ড ফাইল দিয়ে তার মাথায় এক থাবড়া মেরে জিজ্ঞাসা করল, “মাননীয় চেয়ার, আমার স্কলার এই মুহূর্তে কাঁদছেন, তাই তাঁর হয়ে আমিই কিছু কোটেশন দিয়ে এই পেপারের অরিজিনাল বক্তব্যটা তুলে ধরতে চাই। কোটেশনগুলো ওঁর বিভিন্ন সময়ে করা কিছু কালজয়ী পেপারেরই অংশ।” বলেই সুপারভাইজারটা সেই গাবদা ফাইলটা খুলে একটা পেপার বার করে হঠাৎ এক জায়গা থেকে পড়তে লাগল—
তারপর তাইরেসিয়াস ইদিপাসকে বললেন,
“রে পাষণ্ড পামর,
খাসনি তো নিয়তির কামড়!”
প্রেজেন্টার বলল, “আহা ওটা কেন? ওটা তো নয়।"
সুপারভাইজার বলল, “তাই নাকি? আচ্ছা দাঁড়াও।” এই বলে সে আবার একখানা পেপার নিয়ে পড়তে লাগল—
আমরা সবাই আসলে চোর। আমরা যে কে কার থেকে কোনটা চুরি করে চালিয়ে দিই, নিজেও জানি না। চুরি আসলে এক ধরণের কাথারসিস, যার কথা বুচার বা বাইওয়াটার কেউই বলেন নি।
প্রেজেন্টার প্রচণ্ড লজ্জা পেয়ে বলল, “দূর ছাই! কি যে পড়ছে তার নেই ঠিক।”
সুপারভাইজার বলল, “তাহলে কোনটা, এইটা?—তারপর পারো দেবদাসকে রাখি পরিয়ে শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শক্তি সামন্তকে মিলিয়ে দিল— এটাও নয়? আচ্ছা তা হলে দাঁড়াও দেখছি— এক জায়গায় তো দেখছি লিখেছ, ওয়েটিং ফর গোদো-তে দিদির ঘুমানোটা আধুনিক বাংলার একটা সাংঘাতিক সোশিও-ইকোনমিক ক্রিটিক— কি বললে?— এটাও মিলছে না? তা সে কথা আগে বললেই হত। তা হলে নিশ্চয় এটা— ওবাবা এই পেপারটা পুরো সাদা কেন? ও আচ্ছা, এই সেমিনারে তো তুমি ঝাড়া পনেরো মিনিট মাইকের সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে বলেছিলে এটাই তোমার করা জয়েসের ওপর শ্রেষ্ঠ পেপার... "
স্কলারটা ভয়ানক কাঁদতে লাগল, “হায়, হায়! আমার রেজিস্ট্রেশন ফী জলে গেল! কোথাকার এক আহাম্মক সুপারভাইজার, কোটেশন খুঁজে পায় না!”
সুপারভাইজার এদিক-ওদিক তাকিয়ে হিজি বিজ্ বিজ্কে জিজ্ঞাসা করল, “একটা ভালো কোট বলে দিবি? চার আনা পয়সা পাবি।” পয়সার নামে গেস্ট লেকচারার তড়াক্ করে কোট বলতে উঠেই ফ্যাক্ফ্যাক্ করে হেসে ফেলল।
সুপারভাইজার বলল, “হাসছ কেন?”
গেস্ট লেকচারার বলল, “একজনকে শিখিয়ে দিয়েছিল, তুই কোট বলবি যে, শুরুতে বলবি ‘আই কোট’ আর শেষে বলবি ‘এন্ড কোট’। তারপর যেই তাকে কোটেশন জিজ্ঞাসা করেছে, অমনি সে উৎসাহের চোটে ‘আই কোট’ বলে শেষ অব্দি ‘এন্ড কোট’টা বলতে ভুলে গেছে। সেই থেকে তার গোটা জীবনটা কোটেশনের ভেতর চলছে — হোঃ হোঃ হোঃ হো—”
সুপারভাইজার জিজ্ঞাসা করল, “তুমি সেমিনার-টেমিনারে যাও?”
গেস্ট লেকচারার বলল, “হ্যাঁ, সেমিনারে যাই, টেমিনারে যাই, কনফারেন্সে যাই। সেখানে আঁতেলরা থাকে, তারা ঘোঁট পাকিয়ে এর-ওর নামে ইণ্টি-শিণ্টি করে আর মাঝে মাঝে চেয়ারের কাছে গিয়ে তার গায়ের গন্ধ শুঁকে আসে।” বলতেই অশ্রুচাপা শ্মশ্রু ব্যা-ব্যা করে ভয়ানক কেঁদে উঠল।
আমি বললাম, “আবার কি হল?”
সে বলল, “একবার আমাকেও চেয়ার করা হয়েছিল, কিন্তু সবাই আমায় অপছন্দ করে বলে কেউ আমাকে শুঁকতে আসেনি।”
আমি বললাম, “আসেনি তো আসেনি, বাঁচা গেছে। তুমি এখন চুপ কর।”
সুপারভাইজার গেস্ট লেকচারারটাকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি সেমিনারের কিছু বোঝো হে?”
গেস্ট লেকচারার বলল, “তা আর বুঝি নে? একজন পেপার পড়ে আর তার কয়েকজন পোষা অডিয়েন্স থাকে, আর একজনকে পাগলা-গারদ থেকে ধরে নিয়ে আসে, তাকে বলে কি-নোট স্পিকার। তারও কয়েকজন সাগরেদ থাকে, তারা প্লেনারি স্পিকার। এছাড়া একজনকে টাকা দিয়ে চেয়ারে বসানো হয়, সে বসে-বসে ঘুমোয়।”
চেয়ার বলল, “কক্ষনো আমি ঘুমোচ্ছি না, আমার চোখে ব্যারাম আছে তাই চোখ বুজে আছি।”
গেস্ট লেকচারার বলল, “আরো অনেক চেয়ার দেখেছি, তাদের সক্কলেরই চোখে ব্যারাম বা স্পণ্ডি।” বলেই সে ফ্যাক্ফ্যাক্ করে ভয়ানক হাসতে লাগল।
সুপারভাইজার বলল, “আবার কি হল?”
গেস্ট লেকচারার বলল, “এক বেঁটে প্রফেসরের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম ছিল ইউটিলিটারিয়ানিজম, তার আলমারির নাম ছিল উদ্যরিং হাইটস্‌, তার গাড়ুর নাম ছিল শিকাগো ম্যানুয়াল— কিন্তু যেই সে তার কুকুরের নাম দিয়েছে লোডোভিকো ক্যাস্তেলভেট্রো, অমনি কুকুরটা হাঁইহাঁই করে তাকে কামড়ে একেবারে ফর্দাফাই করে দিয়েছে। হোঃ হোঃ হোঃ হো—”
সুপারভাইজার বলল, “বটে? তোমার নাম কি শুনি?”
সে বলল, “এখন আমার নাম গেস্ট লেকচারার।”
সুপারভাইজার বলল, “নমের আবার এখন আর তখন কি?”
গেস্ট লেকচারার বলল, “তাও জানো না? সকালে আমার নাম থাকে ডে-স্কলার আবার আর একটু বিকেল হলেই আমার নাম হয়ে যাবে ফ্রাস্টুখোকা।”

সুপারভাইজার গেস্ট লেকচারারটাকে বলল, “নিবাস কোথায়?”
গেস্ট লেকচারার একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল, হঠাৎ চমকে উঠে বলল, “মিনিবাস? হ্যাঁ হ্যাঁ, মিনিবাসে করে ফিরলে আমরা দিব্য T.A. দিই। আর সরকারি বাসে চাপলে D.A.-র বন্দোবস্তও -”
অমনি ভিড়ের মধ্যে থেকে দুটো প্রফেসর একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “খবরদার D.A.-র কথা বলবি না কানের সামনে!”
চেয়ারটা এতক্ষণ বসে বসে ঢুলছিল। হঠাৎ চটক ভেঙে খুব বাহাদুরি দেখিয়ে বলে উঠলো, “আঃ, সবাই মিলে পেপার পোড়ো না, ভারি অসুবিধে হয় শুনতে।”
শুনে প্রেজেন্টার সুপারভাইজারকে বলল, “ফের সবাই মিলে কথা বলবি তো তোকে মারতে মারতে সাবাড় করে ফেলব।” সুপারভাইজারও বলল, “আবার যদি কাঁদিস তা হলে তোকে ধরে এক্কেবারে পোঁটলা-পেটা করে দেব।”
নেড়া অনেকক্ষণ ধরে এসব দেখে শেষটায় ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে শুরু করল --
"ইদিকে হইচে কি, চাদ্দিক তো এক্কেরে পেপারে পেপারে ছয়লাপ। ইউজিসি-ও চিঠিপত্তের ভিড়ে আর মাথা তুলতে পাচ্ছে না। সব চিঠিই, কেমন বেদর্দ, বেকার ছেলের মতো টাকা চাচ্ছে। "হুজুর চাড্ডি টাকা দিয়েন, কনফারেন্স করব। এই এরিয়ায় সবাই খুব সাট্টিফিকেটের বায়না কচ্ছে। কনফারেন্সের বিষয়: খাদ্যাভ্যাস ও আগামবেন।" বা "চসার, ইংলন্ডের নর্দমা, ও ডিজিটাল ব্লাব্লা: একটি পর্যালোচনা।" চিন্তায় ইউজিসি বিল্ডিঙের গাঁথনি লুজ হয়ে আসছে। এসব কি বলছো খোকা? এ নিয়ে যে কনফারেন্স করবে, পড়াশোনা করেছো গভীরে?
- এঁজ্ঞে?
- বলি পড়াশোনা করেছো, পড়াশোনা??? কনফারেন্স করতে যেটা লাগে।
- (দাঁত বেরুলো) না তো।
- তবে কনফারেন্স করবে যে?!?
- আমাদের একটা স্টেট-অফ-দা-আর্ট কনফারেন্স রুম হইছে। ওটা উদ্বোধন করব। (পুনরায় চিঠি) তাইলে টাকাটা?
অগত্যা দানবের বায়না মেটাতে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন পকেট খুঁড়ে টাকা দিল।
ব্যস্!
অমনি শুরু হয়ে গেল, জংলাভূতু কলেজ ইন কোল্যা উইথ্ মা তারা স্টাডি সেন্টার (অলরেডি কিন্তু আমি এলিটস্য এলিট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছি), অর্গানাইজেজ "ইজ দা পোস্টকলোনিয়াল ডেড?" দশ দিনে পাঁচশোতিয়াত্তর অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। সেগুলোও ভীষণ অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। সবার বক্তব্য, না না না না না না না না না। ডেড মানে? মামদোবাজি? এখনই ডেড হলে আমাদের অ্যাকাডেমিক স্কোর কে দেবে?
তারপর কনভেনারের মেল: ইয়ে... ওভারহোয়েল্মিং রেসপন্স। কিন্তু এতজনকে লাঞ্চে দেওয়ার মতো মুরগি-ছাগল এই তল্লাটে নেই। তাই যাদের পেপার নেওয়া গেল না, তাদের কাছে জাতিস্মর-ঢঙে "ক্ষমা মিনি, ক্ষমা"। আর মাত্র দুশোএকাশিটা পেপার নেওয়া হল দু' দিনের জন্য। প্রতিদিন উনিশটা প্যারালেল সেশন। যারা পড়বে, তারাই শুনবে। নিউক্লিয়ার অডিয়েন্স। ইনটেন্স ডিসকাশন। শুনলেই কনকাশন। টলোমলো প্রশ্ন, আচ্ছা আপনার কি মনে হয় না বর্ষাও আসলে এক ধরনের কলোনিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট?
- ওহ্ অফ কোর্স! ক্লাউডস্ আর হেজিমোনিক!"

নিজের মনের সব বিষ উগরে ন্যাড়া আবার সজ্ঞানে ফিরে এসে চেয়ারকে বলল, “হুজুর, এরা সব পাগল আর আহাম্মক, এদের পেপারের কোনো দাম নেই।”
শুনে সুপারভাইজার রেগে ফাইল আছড়িয়ে বলল, “কে বলল দাম নেই? দস্তুরমতো চার আনা পয়সা খরচ করে কোট বলানো হচ্ছে।” বলেই সে তক্ষুনি ঠক্ঠক্ করে ক’টা পয়সা গুণে গেস্ট লেকচারারের হাতে দিয়ে দিল।
এদিকে হয়েছে কি, কোটেশন বলিয়েরা পয়সা পাচ্ছে দেখে কোট দেবার জন্য ভয়ানক হুড়োহুড়ি লেগে গিয়েছে। সবাই মিলে ঠেলাঠেলি করছে, শেক্সপীয়র-ড্রাইডেনের নামে নতুন নতুন কোট বেরুচ্ছে সবে, এমন সময় হঠাত্ দেখি চেয়ার খুব গম্ভীর হয়ে বলছে, “সবাই চুপ কর, আমি সেমিনারের রায় দেব।” এই বলেই কানে-কলম-দেওয়া নেড়াকে হুকুম করল, “যা বলছি লিখে নাও: মানহানির মোকদ্দমা, ভিকটিম— ওই ন্যাকা স্কলার। আসামী—দাঁড়াও। আসামী কই?” তখন সবাই বলল, “ঐ কনভেনরটাই যত নষ্টের গোড়া”। তাড়াতাড়ি ভুলিয়ে-ভালিয়ে নেড়াকে আসামী দাঁড় করানো হল। নেড়াটা বোকা, সে ভাবল আসামীরাও বুঝি নিজের ডিফেন্সে কোট বললে পয়সা পাবে, তাই সে কোনো আপত্তি করল না।
হুকুম হল— নেড়ার তিনমাস জেল আর সাতদিনের ফাঁসি। আমি সবে ভাবছি এরকম অন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে আপত্তি করা উচিত, এমন সময় হঠাৎ দেখি আমার চারপাশে সবাই বেশ একটা কার্নিভাল শুরু করে দিয়েছে। সবাই নাচছে আর গাইছে --
দেখি দেখি ঢাল তো দেখি দু-চার টুকরো স্ট্যানলি ফিশ,
থিওরির কোফতা বানাই, এই সেশনের নতুন ডিশ্
রিডারের পাঁচফোড়নে
রেসপন্স ম্যাজিক বোনে
চেখে দ্যাখ আমার পেপার, জার্নালে তোর ছাপতে দিস।
কোরাস:
হা রে রে রে রে রে আমায় ছেপে দে রে দে রে।
ISSN বগলে, ঘুরি মনের আনন্দে রে।
আরও আন, আন তো ধরে, কি যেন নাম, হেবারমাস্!
ও ব্যাটার ভড়ং বেশি, শুধরে যাবে, দু-চার মাস
মডার্নিটি ছোটাবো বেশ
সাথে ইনকমপ্লিটনেস
ক্রিটিকেরা বলবে হেসে, পোস্টমডার্নে আমার বাস!
কোরাস:
ছে-পে, ছে-পে, ছে-পে যাও, ভুলে নাওয়া খাওয়া।
এবারের পুজোর ছুটি কাটিয়ে দেব আন্তরিক
সায়েদ আর ভাবার ঘোরে, পোস্টোকলের প্রোজেক্ট (ফিক্) !
নেগ্রি, স্পিভাক, ফানো
কি ভীষণ ট্রেন্ডি, জানো।
নোটে আর সাইটেশনে জায়গামতো রাখছি ঠিক।
কোরাস:
ওরে ভাই, পেপার জমেছে কোণে কোণে।
পাবে-বারে-সেমিনারে কাতারে কাতারে আজ স্কলার বনেছে জনে জনে।
দাঁড়া দাঁড়া বলছি আরও, ঐ যে তোদের লাকাঁ, ফ্রয়েড
ওরা নাকি লিজেন্ড আবার? দুটোই টোটাল প্যারানয়েড!
দয়া দাক্ষিণ্য করে
ওদেরও রাখছি ধরে,
ফ্যালাস আর সান্-মাদারে বিশ্বজোড়া দারুণ ভয়েড।
কোরাস:
মম পুচ্ছে
জড়ো হচ্ছে
থিওরাইজিং...
ট্রালা টিং টিং
ট্রালা টিং টিং
ট্রালা টিং টিং!
আরও চাস? ওক্কে। এবার সিলভিয়া আর টেডের প্রেম।
শেষে গিয়ে সেই তো নারী/বাদ দেব কি? ওটাই Aim !
মেরি শেলী, উলস্টনক্রাফ্ট
পেপারের পঞ্চাশ ড্রাফ্ট
ব্যুভ্যের ট্যুভের সব দিয়েছি, চাপ নেই (জাস্ট ড্রপিং নেম)!
কোরাস:
আয় তবে সহচরী
থোড় বড়ি খাড়া করি
সেমিনারে জুড়ি জুড়ি
করি সুধাপান।
আন তবে থিওরি-ই-ই-ই-ই-ই
দেঁড়েমুশে গেঁড়ে বসে করে দিই ত্রাণ।
হুঁ হুঁ বাওয়া, ভাবছ কি হে? এবার শুধু দিন গোনা
প্রফেসর না হয়ে আমি এই জীবনে থামব না!
দেরিদাও আমার মিতে,
একো ফুকো বাস্তুভিটে,
প্লেটো নিয়ে বলতে দিলেও মাইক ছেড়ে নামব না।
কোরাস:
আমরা সবাই জ্ঞানী এই প্যানপ্যানানির রাজত্বে,
নইলে মোদের ইমেরিটাস মিলবে কি শর্তে?
আমরা সবাই জ্ঞানী।
চুপি চুপি বলছি এবার, আসল কথা শোন্ রে ভাই
পেন চুষে খুব বুঝেছি, থিওরি ছাড়া রাস্তা নাই
প্রাইমারি টেক্সট না জানি,
(তাই) ধরি মাছ না ছুঁই পানি
করি পার বৈতরণী, কোথাও যদি কল্কে পাই!
কোরাস:
ছে-পে, ছে-পে, ছে-পে যাও, ভুলে নাওয়া খাওয়া।
তারনর হঠাৎ বলাকওয়া নেই, আঁতেলটা হঠাৎ পিছন থেকে তেড়ে এসে আমায় “ব্যা” বলে গালি মারল, তার পরেই আমার বইগুলো “দেনায় নিচ্ছি” বলে নিয়ে পালিয়ে গেল। অমনি চারদিকে কিরকম সব ঘুলিয়ে যেতে লাগল, আঁতেলটার মুখটা ক্রমে বদলিয়ে শেষটায় ঠিক আমার হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্টের মতো হয়ে গেল। তখন ঠাওর করে দেখলাম, হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট আমার কান ধরে বলছেন, “ক্লাসে যাওয়ার আগে রেফারেন্স ওয়ার্কের নামে বুঝি লাইব্রেরীতে পড়ে-পড়ে ঘুমোনো হচ্ছে?”
Image courtesy: Google

Comments

Post a Comment